ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম তরুণ অর্থনীতি; দেশের মধ্যম বয়স (median age) মাত্র ২৮ বছর। এই যুব সমাজের উপরই ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার দায়িত্ব বর্তাবে, যাতে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে অ-উৎপাদনশীল প্রবীণ জনগোষ্ঠী মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন এবং নিজেদের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে পারে। এটাই ভারতের জনমিতিক সুবিধা (demographic dividend), যা বিশ্বের বহুদেশ একে ঈর্ষার চোখে দেখে। কিন্তু দেশের বৈষম্যমূলক ও ভারসাম্যহীন অর্থনীতি যুবশক্তিকে যথাযথ ভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়ায় এই সম্পদই ধীরে ধীরে ভারতের বোঝায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আমরা সকলেই বিস্মিত ও মর্মাহত হলাম যখন ১৫মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত একটি মামলার শুনানির সময়, মন্তব্য করেন “…ইতিমধ্যেই এমন কিছু পরজীবী আছে যারা ব্যবস্থার উপর আক্রমণ করে, আর আপনিও তাদের সঙ্গে যোগদিতে চান। এমন কিছু যুবক আছে যারা তেলাপোকার মতো, যারা বেকার … তাদের কেউ মিডিয়ায় যায়, কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায়, কেউ আরটিআই কর্মী হয়, তারপর সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।”

এই মন্তব্যে সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, এমন কঠোর ভাষার বিরুদ্ধে, যা কোনো প্রধান বিচারপতিকে এর আগে প্রকাশ্য আদালতে ব্যবহার করতে শোনা যায়নি। এর আগেও তিনি সরকারের পক্ষে অনেক মন্তব্য করেছেন, কিন্তু প্রতিবাদকে এক মহাপাপ হিসাবে দেখা আর দেশের বেকার যুব সমাজকে উদ্দেশ করে যে অংশটি বললেন তা সত্যিই আপত্তিজনক। যদিও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision) সংক্রান্ত মামলাগুলিতে তাঁর তাৎক্ষণিক ও অসংযত মন্তব্যের সঙ্গে অনেকে ইইতিমধ্যে পরিচিত হয়ে গেছেন, কেউ ভাবতেও পারেননি যে খোদ ধর্মাবতারই এ ধরনের অশোভন মন্তব্য করবেন।

কয়েকটি পরিসংখ্যানের দিকেদেখলেই বোঝা যাবে বেকার যুবকদের এভাবে ‘তেলাপোকা’ (ককরোচ) ও ‘পরজীবী’ বলে আখ্যা দেওয়া কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রায় ৩ কোটি শিক্ষিত যুবক-যুবতী এখন বেকার। এর বাইরে আরও প্রায় ১০ কোটি মানুষ কর্মসংস্থানের আশা হারিয়ে শ্রমবাজার থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন এবং চাকরির সন্ধান করাও বন্ধ করে দিয়েছেন। সম্প্রতি আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটি (Azim Premji University)-র প্রকাশিত ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬' প্রতিবেদন বলে, আজকের বেকার যুবকদের ৬৭ শতাংশই স্নাতক, যেখানে ২০০৪ সালে এই হার ছিলমাত্র ৩২ শতাংশ। এই সমীক্ষা শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যে ক্রম বর্ধমান ব্যবধানের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।

ভারতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুব ৩৬.৭ কোটি, যা দেশের কর্মক্ষম বয়সের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। রিপোর্টটি স্পষ্ট দেখিয়েছে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থের অভাবে ২৬.৩ কোটি যুবক-যুবতী বর্তমানে শিক্ষার বাইরে রয়েছে এবং তাদের অবিলম্বে কর্মসংস্থানের প্রয়োজন।

ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম তরুণ অর্থনীতি; দেশের মধ্যম বয়স (median age) মাত্র ২৮ বছর। এই যুব সমাজের উপরই ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার দায়িত্ব বর্তাবে, যাতে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে অ-উৎপাদনশীল প্রবীণ জনগোষ্ঠী মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন এবং নিজেদের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে পারে। এটাই ভারতের জনমিতিক সুবিধা (demographic dividend), যা বিশ্বের বহুদেশ একে ঈর্ষার চোখে দেখে। কিন্তু দেশের বৈষম্যমূলক ও ভারসাম্যহীন অর্থনীতি যুবশক্তিকে যথাযথ ভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়ায় এই সম্পদই ধীরে ধীরে ভারতের বোঝায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের বর্তমান জনমিতিক সুবিধার (demographic dividend) সময় কাল ২০৩০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করবে। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের রূপান্তর আজ ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিবেদনটি জানাচ্ছে, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ, আর ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২০ শতাংশ আরও উদ্বেগজনক বিষয়, স্নাতক শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার । ১৯৮৩ সাল থেকে এই হার মোটামুটি ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যেই ছিল। কিন্তু গত চার দশকে শিক্ষায় অংশ গ্রহণের হার উল্লেখ যোগ্য (৭৩ শতাংশে)ভাবে বাড়িয়ে এখন শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের অবস্থা ভয়ঙ্কর ও ভয়াবহ।

আমরা যদি এই ক্ষুব্ধ বেকার যুবকদের স্তরের ঠিক আরেক ধাপ নীচে তাকাই, তাহলে আরও চাঞ্চল্যকর এক বাস্তবতা দেখতে পাব—যা ভবিষ্যতের এক বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সদ্য প্রকাশিত ষষ্ঠ জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (NFHS-6) দেখিয়েছে যে ২০২৩-২৪ সালে ভারতে শিশু অপুষ্টির হার ছিল উল্লেখ যোগ্য ৩২ শতাংশ, যা ২০১৯-২১ সালের (NFHS-5) তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত। আরও উদ্বেগজনক যে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলি, মানে সাব-সাহারান আফ্রিকার ২০-২২ শতাংশের তুলনায় ভারতের ৩২ শতাংশ শিশুর অবস্থা অনেক বেশি শোচনীয়। যে দেশে প্রতি তিনজন শিশুর মধ্যে একজন অপুষ্টির শিকার, তারা যখন দুর্বল যুবকে পরিণত হবে, সেদি‌ন কীভাবে এই কঠিন ও প্রতিযোগিতা মূলক নতুন বিশ্বে তারা তাদের স্থান করবে।

অন্য দিকে দেশের শীর্ষস্তরে বিপুল হারে সম্পদ সঞ্চিত হচ্ছে, কিন্তু সেই সম্পদ একটি সীমিত শ্রেণির মধ্যেই আবর্তিত হচ্ছে। বর্তমান ভারতের কর্মসংস্থানহীন অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ফর্মুলাতে পুঁজি অর্জন শ্রীবৃদ্ধি পায় ঠিকই, কিন্তু সরকার বা ধনকুবের, কারোরই সাধারণ মানুষের বাঁচার জন্যে কোনও দায়বদ্ধতা আছে বলে মনে হচ্ছে না। শাসকেরা এ সব বুঝেও কাউকে কর্মসংস্থান তৈরির জন্যে চাপ দিচ্ছে না, বরং ৮০ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে চাল, গম পৌঁছে দিয়েই দায় সারছে । কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি এতটাই মন্থর যে গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অভিবাসনের গতি ও দিক উল্টে যেতে শুরু করেছে— যা যে কোনো জাতির জন্যই অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও পশ্চাদমুখী প্রবণতা। বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কর্মসংস্থানের অভাবে প্রায় ৮ কোটি অ-দক্ষ বা অর্ধদক্ষ শ্রমিক শহর ছেড়ে নিজেদের গ্রামে ফিরে গেছেন। সেখানে তাঁরা কৃষিকাজ-সহ নানা ধরনের খণ্ডকালীন কাজ করে জীবনধারণ করছেন। এটি কোনো দেশের জন্যই গভীর এক পশ্চাদগমন।

কিন্তু ভারতে এ নিয়ে প্রায় কোনো আলোচনাই নেই। বরং অগ্রাধিকার পাচ্ছে ধর্মীয় বিভাজনকে উসকে দেওয়া এবং কোনো একটি সম্প্রদায়কে তার ‘জায়গা’ দেখিয়ে দেওয়ার রাজনীতি। এমন দুর্দশার প্রতি কোনো আদালত স্বতঃপ্রণোদিত (suo motu) হয়ে নজর দিচ্ছে বলে মনে হয় না। সরকারকে ইতিবাচক পদক্ষেপ করতে নির্দেশ দেওয়ার নজিরও বিরল। ভেবেছিলাম সরকার যখন করছে না আদালতই দেশের স্বার্থে নির্দেশ দেবে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল যেন কেবল একটি ক্ষুদ্র সুবিধাভোগী শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ যেন করা হয় ।কিন্তু গত দশ বছরে কর্মসংস্থানের অধিকার, ভারতের যুবসমাজের প্রতি অবিচার, কিংবা শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রশ্নে কোনো যুগান্তকারী রায়ও আমরা দেখিনি। এটি সত্যিই দুঃখজনক।

তার পরিবর্তে আমরা দেশের সর্বোচ্চ বিচারিকপদে আসীন ব্যক্তির কাছ থেকে এমন একটি আঘাতমূলক মন্তব্য শুনছি, যার দৃষ্টান্ত সমগ্র ভারতীয় বিচারব্যবস্থা অনুসরণ করে। সহমর্মিতার একটি শব্দও নেই; বরং বেকারত্বের প্রতি উদাসীনতাও বিরক্তিই প্রকাশ পেয়েছে— যেন যুবসমাজই দোষী, আর তারা এই ব্যবস্থার শিকার নয়। প্রত্যাশা ছিল, আদালত ও সংবাদ মাধ্যম সরকারকে স্মরণ করিয়েদেবে যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণীকে ব্যর্থ করছে। আর তাদের হয়ে প্রশ্ন যাঁরা তুলছেন, সেই আন্দোলনকারী শ্রেণিকে ভারতের সর্বোচ্চ ধর্মাবতার প্রচুর কটূক্তি করেছেন — যা তাঁর এক্তিয়ারের বাইরে। আশা করি ভবিষ্যতে তিনি এই শ্রেণির মামলার শুনানি থেকে নিজেকে বিরত রাখবেন ।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য বহুতরুণ-তরুণীর মনে গভীর আঘাত হেনেছে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের সক্রিয় অংশ প্রধান বিচারপতির অবমাননাকর মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশকরে, এবং পরদিন বেকার যুবকদের সম্পর্কে, ‘তেলাপোকা’ শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে কিংবা ‘আন্দোলন’ বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন— সে বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যায়ও কেউ সন্তুষ্ট হয়নি।

জনরোষ যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল, সেই আবহে ১৬ মে তারিখে অভিজিৎ দিপকে ব্যঙ্গাত্মক ও ভাইরাল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) গঠন করেন। তিনি জনসংযোগ বিদ্যায় বস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী রাজনৈতিক যোগাযোগ-কৌশলবিদ। এর আগে তিনি আম আদমি পার্টির (AAP) ডিজিটাল প্রচারাভিযানে সামিল হয়েছিলেন এবং দলের হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কাজ করেছিলেন। তিনি আসলে বেকার, হতাশ এবং ক্ষুব্ধ ভারতীয় যুবকদের উৎসাহিত করেছেন, যাতে তারা ‘তেলাপোকা’ অপমানসূচক অভিধাটিকেই নিজেদের প্রতীকে পরিণত করে এবং বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলির বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে।

এই আন্দোলন দ্রুত লক্ষ লক্ষ অনুসারী অর্জন করে এবং সামাজিক মাধ্যমে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করে, যদিও তা একই সঙ্গে বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। দলটির উত্থান ছিল অবিশ্বাস্য রকম দ্রুত— মাত্র চার দিনের মধ্যে শূন্য থেকে এক কোটিরও বেশি অনুসারী জুটে গিয়েছে। ২৩ মেনা ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ৩০ লক্ষে পৌঁছায় এবং এক্স (পূর্বতন টুইটার)-এ ২ লক্ষেরও বেশি অনুসারী হয়। এই সংখ্যা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলির— যেমন ভারতীয় জনতা পার্টি (যার শেষ দুটি শব্দ CJP-র সঙ্গেও মিলে যায়) এবং কংগ্রেসের— সামাজিক মাধ্যমের অনুসারী সংখ্যাকেও অতিক্রম করে গিয়েছিল।

কিন্তু এরপর সরকার পাল্টা পদক্ষেপ করে এবং তাদের প্রচারাভিযান ওয়েবসাইট ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এতে অবশ্য আন্দোলনের জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। তবুও দিপকের এই অনলাইন উদ্যোগ যে বহু হতাশ ও বীতশ্রদ্ধ যুবকেরমনে গভীর সাড়া জাগিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।

সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, গত কয়েক বছরে যুবসমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম হতাশা বেড়েছে; মানুষ সরকার, রাজনৈতিক দল এবং বিচারব্যবস্থার প্রতিও আস্থা হারাতে শুরু করেছে।ফলে এই আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরণ যে একদিন ঘটবেই, তা অনেকের কাছেই প্রত্যাশিত ছিল।সর্বোপরি, নানা উপায়ে এমন এক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যেখানে পণ্ডিত নেহরু, নরসিংহ রাও, অটলবিহারী বাজপেয়ী, এমনকি মনমোহন সিংহের আমলের মতো অর্থবহ বিতর্কের আর জায়গা নেই, তেমন দেখাও যায় না।

এখন কেবল বৃহৎ গণ আন্দোলনই কখনও কখনও ভারতীয় শাসক গোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। কৃষক আন্দোলন মাসের পর মাস দিল্লিও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে নাড়া দিয়েছিল, যতক্ষণ না পর্যন্ত সরকার পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপালে প্রতিষ্ঠিত শাসন ব্যবস্থা বিপুল ধ্বংস ও প্রাণহানির পর ভেঙে পড়েছে, কারণ ক্ষুব্ধ যুবসমাজের নেতৃত্বে জনসাধারণ বিদ্রোহে ফেটে পড়েছিল।

ভারতে কেউই এমন বিপর্যয় দেখতে চায় না। কিন্তু তা এড়ানো সম্ভব হবে তখনই, যখন দেশের শাসকরা উপলব্ধি করবেন যে ভারতের যুবসমাজ ক্ষোভে ফুটছে। দেশের এই প্রাণবন্ত, স্পন্দিত যুবশক্তিকে যদি বিদ্যমান ব্যবস্থায থাযথভাবে ধারণ ও আত্মস্থ করতে না পারে, তবে সমগ্র কাঠামোই এমন এক সংকটের মুখে পড়তে পারে, যেখান থেকে আর ফিরে আসার পথ নাও থাকতে পারে।

সর্বত্রই মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে,আর ক্ষমতাসীনদের মুখোশ উন্মোচন করতে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের আশ্রয় নিয়েছে জনগণ। ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র ডিজিটাল নাগাল নিঃসন্দেহে চিত্তাকর্ষক। কিন্তু সেই সমর্থনকে বাস্তবে ইতিবাচ ককর্মকাণ্ডে রূপান্তর করার মতো সাংগঠনিক পরিকাঠামো এখনও তাদের নেই। শুধু হতাশা ও ক্ষোভের এক অত্যন্ত দৃশ্যমান ডিজিটাল প্রকাশ দিয়ে পরিবর্তন আসে না। অশোক সোয়াইনের Struggle Against the State গ্রন্থটি পড়া জরুরি। এই ডিজিটাল ক্ষোভকে যতক্ষণ না বিভিন্ন শহর, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও জনপরিসরে সক্রিয় ভৌত সংগঠনের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ করা না গেলে কেবল হাস্যরসের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘস্থায়ী, শৃঙ্খলাবদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। CJP স্বল্পস্থায়ী সাইবার-জগতের আলোড়ন হিসেবেই থেকে যাবে এবং ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে।

অতএব, এই রাগ যদি কোনও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চায় তবে CJP কে কৌশলগত কর্মসূচিতে রূপান্তরিত করতে হবে। সাংগঠনিক শক্তিও নেটওয়ার্ক ছাড়া শুধু ডিজিটাল বিপ্লবে চলবে না। আর একটা সম্ভবনা হল যদি এটি— অথবা সিজেপি-র দ্বারা অনুপ্রাণিত যুবসমাজের কোনো অংশ— সংঘটিত হয়ে আন্দোলনে রাস্তায় নামে।তবে এর জন্য তাদের অনেক বেশি কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং পরিবর্তন আনার পথে বাস্তব জগতের কঠিন প্রতিরোধের মুখোমুখিও হতে হবে।বেকারত্ব, দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক ঔদ্ধত্য, গণতন্ত্রের ব্যর্থতা কিংবা অর্থনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসমর্থন সম্পন্ন বৃহৎ মঞ্চ গড়ে তুলতে পারে।রাষ্ট্রযন্ত্র কখনই শুধু বিমূর্ত অসন্তোষের প্রতি সাড়া দেয় না। যেকোনও মাটিতে গড়ে ওঠা প্রতিবাদ ও গণ আন্দোলন প্রায়শই সরকারের আক্রমণের মুখে পড়ে—সেই কঠিন দমন-পীড়নের পরিস্থিতি সহ্য করে টিকে থাকতে হয় ।

সিজেপি তাদের প্রথম জন-অভিযানের ঘোষণা করেছে। তারা নাগরিকদের নিজেদের এলাকায় প্রতিদিনের নাগরিক সমস্যাগুলি যেমন-রাস্তার গর্ত, নষ্ট হয়ে যাওয়া পথবাতি, উপচে পড়া আবর্জনা, ইত্যাদি নথিবদ্ধ করে ভিডিও বা ছবি তুলে অনলাইনে পোস্ট করার আহ্বান জানিয়েছে। এই অভিযোগগুলি কে সিজেপি আরও বেশি প্রচার করবে, যাতে প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য পদক্ষেপ করা হয়।আগেই বলেছি আন্দোলনকে শুধু ডিজিটাল, মিম, অডিওভিজুয়াল কনটেন্ট বা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের উপর নির্ভর করলে চলবে না। এই উদ্যোগও তো সেই মূলত অনলাইন ও ডিজিটাল পরিসরেই সীমাবদ্ধ।এটি এখনও পর্যন্ত কোনও উল্লেখযোগ্য শারীরিক উপস্থিতি, গণ সমাবেশ, সংগঠিত জন আন্দোলন বাস্থায়ী মাঠপর্যায়ের কাঠামোর রূপ নিয়েছে বলে মনেহয় না।

পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন একটি মূল নেতৃত্ব গোষ্ঠী, যারা সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট ও রূপান্তরমূলক দাবি এবং একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে মানুষকে দিশা দেখাতে পারবে। তাদের এমন এক বৃহৎ জনসমষ্টিকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, যাদের মধ্যে মত ও কৌশলের ব্যাপকপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলি একটিঅভিন্ন ছাতার তলায় একত্রিত হয়ে সংশোধনের আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারে। ইতিহাস ক্রমশপ্রকাশ্য — দেখা যাক, কী আছে কপালে — ছক্কা না সেই পুট।

No comments on 'আরশোলা, আন্দোলন, অতঃপর'

Leave your comment

In reply to Some User