প্রবাল ছিলেন এসপারেন্তো ভাষা প্রচারক কমিটির সভাপতি এবং এস্পারেন্তো ভাষায় পারদর্শী। লিখেছেনও কিছু প্রবন্ধ সে ভাষায়। ভাষাতত্ত্বের বাইরে সাহিত্য-দর্শন-রাজনীতি-সঙ্গীত, সকল বিষয়ে তিনি ছিলেন বিদগ্ধ ও রসজ্ঞ।
প্রবাল দাশগুপ্ত, আন্তর্জাতিক মানের ও খ্যাতনামা শেষ বাঙালী ভাষাতাত্ত্বিক, গতরাতে কোলকাতার নিজ বাসভবনে গভীর রাতে মারা গেছেন। তার বয়স আমার কাছাকাছি — ৭৩ বছর।
প্রবাল মাত্র ২৮ বছর বয়সে নিউইর্য়ক ইউনিভার্সিটি থেকে ভাষাতত্ত্বে ডক্টরেট প্রাপ্ত। তাঁর প্রচুর লেখা আছে ভাষাতত্ব, কগনিটিভ সাইন্স এবং নিউরো-বায়োলোজি — আমি একটু বোঝার চেষ্টা করেছিলাম।
প্রবাল ছিলেন এসপারেন্তো ভাষা প্রচারক কমিটির সভাপতি এবং এস্পারেন্তো ভাষায় পারদর্শী। লিখেছেনও কিছু প্রবন্ধ সে ভাষায়। ভাষাতত্ত্বের বাইরে সাহিত্য-দর্শন-রাজনীতি-সঙ্গীত, সকল বিষয়ে তিনি ছিলেন বিদগ্ধ ও রসজ্ঞ।
অনেক দিনের পরিচয় এবং যোগাযোগ। তাঁর ছিল একটা অসাধারণ সেন্স অব হিউমার, আন্তর্জাতিকতাবোধ এবং সৌজন্য।
আমার একটি প্রবন্ধ "বাংলার ফারসি উত্তরাধিকার"-এর এই অংশটি আমি প্রবালের সাথে প্রচুর আলোচনা করে লিখেছিলাম।
"বাংলা ভাষার শব্দভান্ডার সম্পর্কিত আমারএকটি দারুণ অনুমান পেশ করার রয়েছে। উত্তর ও পশ্চিম ভারতের অন্যান্য ভাষাগুলি সংস্কৃত বা আরবি থেকে নিষ্পন্ন হয়েছে। কিন্তু হিন্দি বা উর্দুর মতো বাংলায় সাধারণ 'খাওয়া' শব্দ দিয়ে ধুমপান ও পান করা বোঝানো হয় যা সংস্কৃত মূল 'খানা' বা খাওয়া থেকে উৎপন্ন হয়েছে। তবে আক্ষরিক স্তরে'পানা' নামে একটি সংস্কৃত তৎসম শব্দ রয়েছে যা'পান করা' কে বোঝায়। ধূমপান বা কোনও কিছু শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করাকেও বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়- 'ধূম্রপান' বা স্মোকিং। কিন্তু চলতি কথোপকথনের বাংলায় এগুলির ব্যবহার হয় না বললেই চলে।
আমার বক্তব্য হল এর উৎস মূলেরসন্ধান পাওয়া যেতে পারে মধ্যযুগীয় পারস্যে যেখানে'খাওয়া' শব্দ দিয়ে তিন রকম ক্রিয়াকেই বোঝানো হ'ত। পরবর্তী কালে ফারসি ভাষায় প্রতিটির জন্য পৃথক শব্দ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু জানা যাচ্ছে আজও ইরানি, দারি ও তাজিক ভাষীরা ধূমপান ও পান করাকে বোঝাতে সাধারণত 'খাওয়া' ক্রিয়া পদটি ব্যবহার করে থাকেন। বাঙালিরা এই প্রবণতা কোথা থেকে পেয়েছিলেন তা ব্যাখ্যা করতে আমার মনে এটা ছাড়া আর কিছু আসছে না। ফারসি দরবারে এগুলি যত্নে লালিত হয়েছিল। অপভ্রংশ থেকে যে চারটি ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল তার মধ্যে মৈথিলীর 'খাওয়া' নিয়ে এমন কোনও নির্দিষ্টতা নেই।
পান করা ও ধূমপান বোঝাতে ওড়িয়া অবাধ 'পানা' ব্যবহার করে, কিন্তু মধ্যযুগীয় ফারসির অনুকরণে বাংলা ও অসমিয়া খাওয়া, পান করা ও ধূমপান বোঝাতে 'খাওয়া' শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। বাংলায় তা ছাড়া আমরা দেখি যে ক্রিয়াপদ লিঙ্গ অনুযায়ী পরিবর্তনহয় না।
বাংলা ভাষার সরাসরি কোনও বিশেষ্য-ক্রিয়া-বিশেষণ সম্পর্ক নেই। আমরা দেখতে পাই চতুর্দশ থেকে যষ্ঠদশ শতকে ফারসি ভাষা ও বাক্যের লিঙ্গভিত্তিক গঠন অনুসরণ করেনি। তবেআমাদের উল্লেখ করতে হবে বাংলার উপর তিব্বতি-বর্মার ও অস্ট্রিক ভাষার প্রভাব পড়েছে এবংদীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে এর ব্যবহার ছিল। বাংলা সম্ভবত এই লিঙ্গ-শূন্য গঠন গ্রহণ করেছে তাদের থেকে এবং অসমিয়া ও ওড়িয়ারও একই ব্যাকরণগত প্রবণতা রয়েছ যেহেতু পূর্বাঞ্চলের এই তিন ভাষাই প্রতিনিধিত্ব করছে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের।
তবে মৈথিলী অনুসরণ করে ভারতীয় ভাষার প্রচলিত নিয়মতান্ত্রিকতাকে, অর্থাৎ বিশেষ্য পদের লিঙ্গনির্ধারণকারী ক্রিয়াপদকে। এই থেকে আমাদের বিশ্বাস হয় যে চতুর্দশ শতকের দিকে মৈথিলীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে যখন ইলিয়াস শাহী শাসকরা বাংলাকে যথার্থ ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তাদের উৎসাহ ও তাদের লিঙ্গমুক্ত ব্যাকরণ হয়ত বাংলার উপর প্রভাব ফেলেছিল অসমিয়া ও ওড়িয়ার চেয়ে বেশি। 'পূর্বাঞ্চলীয় ইকোসিস্টেমে' এই ভাষাগুলি প্রস্ফুটিত হয়েছিল। বাংলায় 'লিঙ্গবিহীন' বাক্য গঠন প্রকটভাবে বিদ্যমান রয়েছে। খুব সম্ভবত বাংলাভাষার এই প্রবণতা ফারসিভাষী শাসকদের প্রভাবের ফলে গ্রহণযোগ্যতা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল। তাদের শাসনকালে শৈশবে উপনীত হওয়া বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক পর্বের এটা আরেক বৈশিষ্ট্যও।"
ভাষাতত্ত্ব নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন থাকলে প্রবালকে ফোন করতাম। এখন কাকে করব ? তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
