আমরা সকলেই জানি অষ্টম শতক থেকেআরব ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারকদের সঙ্গে ইসলামিসংস্কৃতি বাংলায় প্রবেশ করেছিল। আর এও জানি যে১২০৪ সালে ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ারখিলজি বাংলার সেন বংশকে উৎখাত করে শাসনক্ষমতা দখল করেন। এর পরেই ইসলামের প্রভাববিস্তার হতে থাকে। এভাবে পূর্ব দিকে বাংলা হয়ে ওঠেদিল্লির নব্য প্রতিষ্ঠিত সুলতান বংশের অন্যতমপ্রদেশ।

এই সুলতানি বংশ আবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলপারস্যের তুর্কিদের হাতে । এই বিজয় এক নতুনযুগের সূচনা করেছিল। মধ্যযুগীয় ইরানিয় বিশ্বেরঅধীনে চলে আসে বাংলা। এই ইরান আব্বাসিদেরশাসনে বিবর্তিত হয়েছে। স্থানীয় তুর্কিশাসকরা ফারসিকে যোগাযোগের ভাষা বা লিঙ্গুয়াফ্রাঙ্কা হিসেবে ব্যবহার করতেন কারণ বিভিন্ন তুর্কি ওআফগান গোষ্ঠীর নিজস্ব জেলার ভাষা ও উপভাষাছিল যা মূলত মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের।

ফারসি সবাই বুঝতে পারতেন। তুর্কি অধ্যুষিতমধ্য এশিয়ায় কেবলমাত্র একটি জনগোষ্ঠী ছিলযারা ফারসির পূর্বাঞ্চলীয় আঙ্গিকে কথা বলত ওলিখত। এরা হল তাজিক গোষ্ঠী। এদের ভাষা ওসংস্কৃতি আধুনিক তাজিকিস্তানেই শুধু প্রসারিত নয়সেইসঙ্গে উজবেকিস্তানের বোখারা ও সমরখন্দেরশহরগুলিতেও এর প্রভাব রয়েছে। আমরা এটিবিশেষভাবে উল্লেখ করছি কারণ ইসলামি বাংলায় প্রথমদিকে ফারসি বিশারদরা অধিকাংশই ছিলেন তাজিক। তখন ইরান থেকে ফারসিভাষী খুবই কম ছিল, তাই অতএব মধ্য এশিয়ার তাজিকেরা ফারসি ভাষার রাজকর্মী হিসাবে কাজ চালাত।

তাঁদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার মুসলিমশাসকরা পারস্যের অনুকরণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম কানুন চালু করেন এবং এর প্রচুরপ্রভাব পড়েছিল স্থানীয় মানুষের জীবন ওসংস্কৃতিতে। প্রথম বড় বদল ছিল রাজতন্ত্র ওরাজ্যশাসন কার্যের ফারসি ঐতিহ্য- যা ঘটনাচক্রেপ্রাক্ইসলামি এবং এটি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিলগৃহস্থালী সামরিক ও রাজনৈতিক কাজে ব্যবহৃতআমদানিকৃত দাসদের উপর। দ্বিতীয় বড় বৈশিষ্ট্যছিল উন্নত মানের বাণিজ্যিকীকরণ - যার ফলে একনগদী অর্থনীতির জন্ম হয়েছিল। এই দুটি যদিওবাংলায় নতুন ছিল কিন্তু তা সফল ভাবে গৃহীত হয়েছিল।

সাসানীয় সাম্রাজ্যের অনুকরণে দরবার সংস্কৃতিশুরু করেছিল গৌড় ও পাণ্ডুয়া। রাষ্ট্রপরিচালনার একনির্দিষ্ট শৈলীর সংস্পর্শে আসে বাংলা যা অবস্থিতছিল স্বচ্ছ ও আইনি বিধির উপর এবং একে কার্যকরীকরতেন প্রশিক্ষিত আমলারা। আগের হিন্দু ও বৌদ্ধযুগের চেয়ে এ ছিল বেশ আলাদা। পারসিক কায়দারএই রাষ্ট্রপরিচালনা পদ্ধতি এতটাই সফল হয়েছিলযে, ১৩৫২ সালে দিল্লির সুলতানদের থেকে বাংলারসুলতানরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরও তা অব্যাহতছিল। বাংলার সুলতানরা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিকরেছিলেন। আমরা দেখতে পাই যে ইলিয়াস শাহীসুলতানরাও জোর দিয়েছিলেন 'খলিফাতন্ত্র ও ইরানিসংস্কৃতির উপর' (করিম ১৯৬০ পৃ . ১৮ ) । ১৩৭৫সালে পান্ডুয়ায় নির্মিত মহান আদিনা মসজিদপ্রতিফলিত করেছিল এক স্বতন্ত্র রাজকীয় দিককে — সাসানীয় ইরানের রাজকীয় শৈলীর ছায়া রয়েছেএতে।

১৪৩০-এর দশকে, আমরা দেখতে পাইজালালউদ্দিন এর একলাখি সমাধিস্তম্তের মাধ্যমেপারসি সংস্কৃতির উপর কীভাবে বাংলার প্রভাবপড়তে শুরু করল এবং তাও বিশাল আকারে ।বাংলার বৌদ্ধ স্থাপত্যের চিহ্ন ছিল এই সমাধিস্তস্তেএবং ভবন নির্মাণের স্থানীয় ও লৌকিক রীতিও গৃহীতহয়েছিল। সুলতানদের সক্রিয় উৎসাহে উঠে এসেছিলস্থাপত্যের এক নতুন বাঙালি শৈলী।

যে বিষয়টি অল্প জ্ঞাত তা হল, ত্রয়োদশ শতকেপারস্যায়িত তুর্কিরা আসার আগে বাংলারঅধিকাংশ অঞ্চলে ধাতুর মুদ্রার প্রচলন ছিল খুবইকম। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই বাণিজ্য ও অর্থনীতিরহাল ছিল মন্থর এবং স্বল্প মূল্যের আদানপ্রদানেরজন্য ছিল গো-বিনিময় প্রথা । তবে আশ্চর্যের বিষয়হল এই অঞ্চলের হিন্দু রাজাদের ভান্ডারে ছিল বিপুলপরিমাণে কাঁচা রুপো - যাছিল তাদের সম্পদেরএকটা বড় অংশ। এর আকর্ষণেই আসত লুণ্ঠনকারীও বিজয়ীরা। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে বাংলায়মুসলিম শাসনের প্রতিটি পর্বে ধাতব মুদ্রা তৈরি বৃদ্ধিপেয়েছিল এবং তা ছিল সুলতানের স্বীকৃতিরচিহ্নস্বরূপ খোদাই করা। ডেয়েলের মত অনুযায়ীরুপোর কয়েন বা বাংলার 'টঙ্কা'য় ভর করে আগেরধীর গতিসম্পন্ন বাণিজ্য ও উৎপাদনের চাকাদারুণভাবে গড়াতে শুরু করে ( ডেয়েল পৃ . ২২৭ ) ।অর্থনীতি নির্দিষ্ট একটি চেহারা নেয়।

রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠিত হতে থাকে দ্রুতএবং রাজস্ব ও পরিসম্পদের উপর ভিত্তি করেশাসকদের শ্রেণি নির্ধারিত হতে থাকে সাধারণতধাতব মুদ্রার নিরিখে। পার্সি শাসনের অন্যতমঅবদান ছিল পেশাদারী ও বেতনভূক প্রশাসনিকপরিকাঠামো নির্মাণ যা ছিল স্বচ্ছ ও বহু-স্তরীয়।এইভাব স্থানীয় আধিকারিকরা নিজেদের উন্নতিসাধনে বা টিকে থাকতে বাহিনীর খেয়ালি ব্যবহারেরউপর কম নির্ভর করতেন।

বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের নিরিখে পরবর্তীবড় প্রভাব জেগে উঠেছিল ভাষা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্রে।আমরা যেমনটা দেখব অন্য ভাষাগুলি সংস্কৃত বাআদি তামিলের বিচ্যুতির পথ ধরেছিল এবং ভাষাগড়ে উঠেছিল । কবি জয়দেব সংস্কৃতে 'গীতগোবিন্দ' রচনা করেছিলেন এবং এই চিরায়ত সাহিত্যকেবাংলা, বিহার, ওড়িশা ও অসমের নিজস্ব সম্পদহিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও তখনও পর্যস্ত এইঅঞ্চলগুলির একান্ত নিজের ভাষা গড়ে ওঠেনি। মূলকথা হল এই রচনার কয়েক দশক পরে মুসলিমরাযখন বাংলা জয় করলেন তখন বাংলা ভাষা প্রাক্গাঠনিক স্তরে ছিল এবং তখনও পূর্ণরূপ প্রাপ্তি বাস্বীকৃতি থেকে দূরে। ভাষাতাত্বিকদের মত - দশম বাএকাদশ শতক থেকে বাংলা ধীরে ধীরে বিবর্তিতহচ্ছিল যখন 'চর্যাপদ' লেখা হচ্ছিল। আমাদেরনিরীক্ষণ করতে হবে, চতুর্দশ শতকে বাংলাকে স্বাধীনভাষা হিসেবে 'মুক্তি' দিতে তুর্কি শাসক ও তাঁদেরপ্রাতিষ্ঠানিক ফারসি ভাষা কোন ভূমিকা পালনকরেছিল। বাংলায় মুসলিম বিজয়ের প্রায় দেড় শতকপরে সিসতানি তুর্কি শাসক সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহীইতিহাসে প্রথমবার যখন বাংলার ভাঙাটুকরোগুলিকে জোড়া দিলেন তখন এক বিপ্লবসংঘটিত হয়েছিল। ১৩৫২ সালে দিল্লির সুলতানদেরথেকে নিজেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন ইলিয়াসশাহ এবং সেইসঙ্গে নিজেকে বাংলার মানুষের শাসকহিসেবে ঘোষণা করে হন “শাহ বাঙ্গালিয়ান”। এইপ্রথমবার এক নির্দিষ্ট রাজত্ব বা দেশ হিসেবে বাংলাইতিহাসে নথিভুক্ত হল — বাংলার বিভিন্ন খণ্ডিতঅংশ যেমন গৌড়, সাতগাঁও, পৌণ্ড্র, বরেন্দ্র, রাঢ়, সমতট, হরিকেল্লা ভাঙা বা সোনারগাঁও ( মুরশিদ ৩৫) হিসেবে নয়। ইলিয়াস শাহী ও তাঁর উত্তরসুরিরাকেবল ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হননি বরং দুই শতকেরবেশি সময় ধরে বাংলা যাতে পৃথক স্বায়ত্তশাসিত সুলতানি সাম্রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে তা নিশ্চিত করেছিলেন।

দিল্লি অবশ্য বেশ কয়েকবার একে দখল করারউদ্যোগ নিয়েছে। দিল্লির এই আগ্রাসন রোধ করতেইলিয়াস শাহী শাসকদের দরকার ছিল স্থানীয়মানুষদের সমর্থন ও সহযোগিতা । ইতিহাসে তাঁরাইপ্রথম সরকারি কর্তৃপক্ষ যাঁরা বাংলার ভাষা ওসংস্কৃতির উন্নয়নে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। বাকি উত্তরভারতের তুলনায় এ ছিল বেশ পৃথক। যদিওপশ্চিমবঙ্গের হিন্দু অভিজাতদের এই নিয়ে অনেকবিপরীত বক্তব্য রয়েছে। কিন্তু যে সত্যটা রয়ে গেছেসেটা হল ভাষা হিসেবে সংস্কৃত থেকে ভেঙে বাংলাবেরিয়ে এসেছিল এবং স্বাধীন সুলতানদের আমলেইএই ভাষার শ্রীবৃদ্ধি হয়। এই অঞ্চলের সাধারণমানুষের মুখের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেনসুলতানরাই। বাংলার ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, সামাজিকনেতা ও পুরোহিত শ্রেণি এতে খুশি হননি এবং তাঁরাসংস্কৃত ভাষার ব্যবহারই চালিয়ে গিয়েছেন তথাকথিতনিম্ন শ্রেণির মানুষের ভাষাকে ব্যাপকভাবে উপেক্ষাকরেই। তবে চন্ডীদাসের মতো দরিদ্র গ্রামীণ ব্রাহ্মণএই ধরনের বর্ণবাদী হুকুমাদেশে তেমনভাবে কর্ণপাত করেননি। এই সময়কালে তিনি পথ দেখিয়েছিলেন- বাংলায় রচনা করেছিলেন 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন'। এররচনাকাল নিয়ে মত বিভেদ রয়েছে তবে বাংলায়স্বাধীন সুলতানি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার এক শতকেরমধ্যেই হবে। এরই কাছাকাছি সময়ে আমরা মিথিলারবিদ্যাপতির কথা জানতে পারি। লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী অধিগ্রহণ করার পর বাংলায় তুর্কি শাসনপ্রতিষ্ঠার দুই শতকের বেশি সময় পরে বিদ্যাপতিররচনা বিকাশ লাভ করেছিল যদিও বাংলা, বিহার ওওড়িশার মানুষ তাকে নিজেদের বলে দাবি করেনযেহেতু ভাষাটি প্রায় একই।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বাংলার জনগণেরসঙ্গে যোগাযোগের এই নব্য সুযোগ পূর্ণমাত্রায় গ্রহণকরেছিলেন মুসলিম লেখকরাও । শাহ মুহাম্মদসাগির তাঁর 'ইউসুফ জুলেখা'তেআরবি ফারসি শব্দের বহুল ব্যবহার করেন। সম্ভবতপঞ্চদশ শতকের শুরুর দশকে তিনি পবিত্রকুরআনের শিক্ষা ও ইসলামি শিক্ষার উপরেও জোর দেন। ধর্মীয় আখ্যান থেকে তিনি ভালোবাসার গল্পতুলে আনেন, বিষয় যদিও মধ্যপ্রাচ্য থেকে ধার করেআনা । তবে পটভূমি ছিল বাংলারই । ব্যবহৃত হয়েছেস্থানীয় প্রবাদ প্রবচন এবং এর স্বাদও বঙ্গীয়। যাইহোক লিখন, অন্বয় ব্যাকরণ ও উচ্চারণ সুসংহত হতেবাংলা ভাষায় সময় লেগে গিয়েছিল প্রায় দুই হাজারবছর। তবে তুর্কি-ফারসি শাসকদের বদান্যতায়সাধারণ মানুষের অসংগঠিত ভাষা দরবারের স্বীকৃতভাষায় পরিণত হয়েছিল।

বাংলাভাষী মানুষদের একই রাজত্বের মধ্যেসংঘবদ্ধ করার শামসুদ্দিনের যে সিদ্ধান্ত তার সাতদশক পরে, বাংলা ভাষার জনপ্রিয়তা সম্বন্ধে প্রত্যক্ষপ্রমাণ পাই চৈনিক পর্যটক মা হুয়ানের কাছ থেকে।১৪২৫ ও ১৪৩২ সালের মধ্যে তিনি বাংলায়এসেছিলেন এবং নথিভুক্ত করে গিয়েছেন যেসুলতানের দরবারে ফারসি সরকারি ভাষা হলেওবাংলা ভাষা সর্বজনীনভাবে এখানে উপস্থিত ( মাহুয়ান পৃ . ১৬১ ) । এই সময়ের কাছাকাছি পর্বে, বিশ্বাস করা হয় যে সুলতান জালালউদ্দিন রামায়ণকে সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে কৃত্তিবাস ওঝাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তিনি যাকরে ছিলেন তা বাংলা ভাষার উন্নতির ক্ষেত্রে একমাইলফলক। ওঝা কিছু টিপিক্যাল বাঙালি ধারণা ওউপাদান নিয়ে এসেছিলেন তাঁর রচনায়। এই শতকে, ১৪৮০ সাল নাগাদ, সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইনশাহ তার হিন্দু দরবারি মালাধর বসুকে বাংলায়'শ্রীকৃষ্ণবিজয়' রচনা করতে উৎসাহিত করেছিলেন।পরের কয়েক দশকে নুসরত শাহ, পরাগল খাঁ ও ছুটি খায়ের মতো শাসকরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেরউন্নতিতে ভীষণভাবে জোর দেন। বাংলা ভাষারউন্নতিতে পারস্যায়িত তুর্কি শাসকদের যে বিপুলভূমিকা তার ততখানি স্বীকৃতি দেওয়া হয় না বা যেটুকুস্বীকৃতি দেওয়া হয় তার চেয়ে অনেক বেশি।

সুলতান ও ইরানের ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফলে বাংলা ভাষায় ঢুকে পড়েছে অজস্র ফারসি ওআরবি শব্দ স্বাভাবিকভাবেই। বাংলাদেশি পণ্ডিতরাগণনা করে দেখিয়েছেন বাংলায় ৫ হাজারের বেশিশব্দ ও অভিপ্রকাশের উৎস ফারসি , আরবি তবে বেশিরভাগই ফারসি। মজার বিষয় হল হিলালিউল্লেখ করেছেন , 'এই শব্দ ও অভিপ্রকাশের বেশকিছু বাংলায় এমনভাবে রূপান্তরিত হয়েছে যেধ্বনিতত্ব ও বানানের দিক থেকে সেগুলিকে চেনাইদায়’( হিলালি পৃ . ৫ ) । এর অর্থ হল ফারসি শব্দ ওখণ্ডিত বাক্যগুলি বাঙালি উচ্চারণরীতির সঙ্গেএমনভাবে মিশে গিয়েছে ও এমনভাবে বানান করাহয় যে বাংলাভাষীরাও উপলব্ধি করে না যে, তারাবিদেশি ভাষা উচ্চারণ করছে। এমনকি যারা শুনছেতারাও বুঝতে পারে না।

বাংলা ভাষার শব্দভান্ডার সম্পর্কিত আমারএকটি দারুণ অনুমান পেশ করার রয়েছে। উত্তর ওপশ্চিম ভারতের অন্যান্য ভাষাগুলি সংস্কৃত বাআরবি থেকে নিষ্পন্ন হয়েছে। কিন্তু হিন্দি বা উর্দুরমতো বাংলায় সাধারণ 'খাওয়া' শব্দ দিয়ে ধুমপান ওপান করা বোঝানো হয় যা সংস্কৃত মূল 'খানা' বাখাওয়া থেকে উৎপন্ন হয়েছে। তবে আক্ষরিক স্তরে'পানা' নামে একটি সংস্কৃত তৎসম শব্দ রয়েছে যা'পান করা' কে বোঝায়। ধূমপান বা কোনও কিছুশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করাকেও বোঝাতে এটি ব্যবহৃতহয়- 'ধূম্রপান' বা স্মোকিং। কিন্তু চলতিকথোপকথনের বাংলায় এগুলির ব্যবহার হয় নাবললেই চলে। আমার বক্তব্য হল এর উৎসমূলেরসন্ধান পাওয়া যেতে পারে মধ্যযুগীয় পারস্যে যেখানে'খাওয়া' শব্দ দিয়ে তিন রকম ক্রিয়াকেই বোঝানোহ'ত। পরবর্তী কালে ফারসি ভাষায় প্রতিটির জন্যপৃথক শব্দ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু জানা যাচ্ছআজও ইরানি, দারি ও তাজিক ভাষীরা ধূমপান ওপান করাকে বোঝাতে সাধারণত 'খাওয়া' ক্রিয়া পদটিব্যবহার করে থাকেন। বাঙালিরা এই প্রবণতা কোথাথেকে পেয়েছিলেন তা ব্যাখ্যা করতে আমার মনে এটাছাড়া আর কিছু আসছে না। ফারসি দরবারে এগুলিযত্নে লালিত হয়েছিল। অপভ্রংশ থেকে যে চারটিভাষার উৎপত্তি হয়েছিল তার মধ্যে মৈথিলীর 'খাওয়া' নিয়ে এমন কোনও নির্দিষ্টতা নেই। পান করা ওধূমপান বোঝাতে ওড়িয়া অবাধ 'পানা' ব্যবহার করে, কিন্তু মধ্যযুগীয় ফারসির অনুকরণে বাংলা ওঅসমিয়া খাওয়া, পান করা ও ধূমপান বোঝাতে'খাওয়া' শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। বাংলায় তা ছাড়াআমরা দেখি যে ক্রিয়াপদ লিঙ্গ অনুযায়ী পরিবর্তনহয় না। বাংলা ভাষার সরাসরি কোনওবিশেষ্য-ক্রিয়া-বিশেষণ সম্পর্ক নেই। আমরা দেখতেপাই চতুর্দশ থেকে যষ্ঠদশ শতকে ফারসি ভাষাওবাক্যের লিঙ্গভিত্তিক গঠন অনুসরণ করেনি। তবেআমাদের উল্লেখ করতে হবে বাংলার উপরতিব্বতি-বর্মার ও অস্ট্রিক ভাষার প্রভাব পড়েছে এবংদীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে এর ব্যবহার ছিল। বাংলাসম্ভবত এই লিঙ্গ-শূন্য গঠন গ্রহণ করেছে তাদেরথেকে এবং অসমিয়া ও ওড়িয়ারও একই ব্যাকরণগতপ্রবণতা রয়েছ যেহেতু পূর্বাঞ্চলের এই তিন ভাষাইপ্রতিনিধিত্ব করছে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের।তবে মৈথিলী অনুসরণ করে ভারতীয় ভাষার প্রচলিতনিয়মতান্ত্রিকতাকে, অর্থাৎ বিশেষ্যপদের লিঙ্গনির্ধারণকারী ক্রিয়াপদকে। এই থেকে আমাদেরবিশ্বাস হয় যে চতুর্দশ শতকের দিকে মৈথিলীর সঙ্গেবিচ্ছেদ ঘটে যখন ইলিয়াস শাহী শাসকরা বাংলাকেযথার্থ ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তাদেরউৎসাহ ও তাদের লিঙ্গমুক্ত ব্যাকরণ হয়ত বাংলারউপর প্রভাব ফেলেছিল অসমিয়া ও ওড়িয়ার চেয়েবেশি। 'পূর্বাঞ্চলীয় ইকোসিস্টেমে' এই ভাষাগুলিপ্রস্ফুটিত হয়েছিল। বাংলায় 'লিঙ্গবিহীন' বাক্য গঠনপ্রকটভাবে বিদ্যমান রয়েছে। খুব সম্ভবত বাংলাভাষার এই প্রবণতা ফারসিভাষী শাসকদের প্রভাবেরফলে গ্রহণযোগ্যতা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল। তাদেরশাসনকালে শৈশবে উপনীত হওয়া বাংলা ভাষারঐতিহাসিক পর্বের এটা আরেক বৈশিষ্ট্যও।

গ্রন্থপঞ্জী

১।জে ডেয়েল, দ্য চায়না কানেকশন : প্রবলেমস অফসিলভার সাপ্লাই ইন মেডিএভ্যাল বেঙ্গল। জে এফরিচার্সের সম্পাদনায় প্রকাশিত 'প্রিসিয়াস মেটালসইন লেটার মেডিয়েভ্যাল অ্যান্ড আর্লি মডার্নওয়ার্ল্ডস

২ / জি এম হিলালি, পার্সো-অ্যারাবিক এলিমেন্টসইন বেঙ্গলি

৩ / আবদুল করিম, কপার্স অফ দ্য মুসলিম কয়েনসঅফ বেঙ্গল, এশিয়াটিক সোসাইটি অফ পাকিস্তান

৪ / মা হুয়ান, ইঙ্গ-ইয়াই শেঙ্গ ল্যান : দ্য ওভারঅলসার্ভে অফ দ্য ওশেনস শোরস

৫ / গোলাম মুরাশিদ, বেঙ্গলি কালচার ওভার এথাওজ্যান্ড ইয়ারস্‌ , নিয়োগী

No comments on 'বাংলার ফারসি উত্তরাধিকার '

Leave your comment

In reply to Some User