রবীন্দ্রনাথের অহিংসা, সহিষ্ণুতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বিশ্বভ্রাতৃত্বের দর্শন ধর্মীয় মৌলবাদের মূল চেতনার এতটাই বিরোধী যে, আরএসএস ও বিজেপি জোট যতই শাক দিয়ে মাছ ঢাকুক না কেন, গন্ধ ঠিক নাকে আসে। সাম্প্রতিক উদাহরণ, হিমন্ত বিশ্ব শর্মা 'সোনার বাংলা' গাওয়ার দুঃসাহসকে 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা' বলে দাগিয়ে দিলেন। ইতিহাস কি জানেন তিনি ?
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আবারও নতুন উদ্যমে তাঁর নিন্দার্হ কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে বেড়াচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীত 'আমার সোনার বাংলা' গানটি গাওয়াকে 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা' বলে দাগিয়ে দিলেন। তাঁর চোখে এমন কাজ করে যিনি কাঠগড়ায় 'আসামী', তিনি অসমের শ্রীভূমি জেলার এক বাঙালি কংগ্রেস নেতা, যিনি সরল মনে বাঙালি ও বাংলা ভাষার প্রতি সহজাত আবেগ থেকেই গানটি গেয়েছিলেন। অসমের মুখ্যমন্ত্রীর যুক্তি — ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ যখন এই নিৰ্দিষ্ট গানটি তাদের জাতীয় সংগীত হিসাবে বেছে নিয়েছে তারপরও ভারতে থেকে এই গান গাওয়ার একটাই অর্থ — দেশের প্রতি বিস্বাসঘাতকতা। (অথচ কোন নথিতে এই গানের 'প্রোপাইটরি রাইট' বা কপিরাইট কেনার কথা উল্লিখিত বাংলাদেশের তরফে, তা বাপু জানা নেই. হেমন্তেরও জানা নেই — নিশ্চিত।) আমার কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জাগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তো বাংলায় প্রচারে এসে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের আকর্ষণ করার জন্য উচ্চকণ্ঠে 'আমার সোনার বাংলা' বলে আহবান জানান, যার ভিডিও প্রমাণও সুলভ, তবে কি হিমন্ত তাঁকেও 'রাষ্ট্রদ্রোহী' বলে দাগিয়ে দেবেন?
যে কোনও শিক্ষিত দক্ষিণ এশীয়বাসী জানে, বাংলাদেশের 'জাতীয় সংগীত' বেছে নেওয়ার জন্য গানের এক বিরাট ভাণ্ডার মজুত ছিল। তালিকায় যেমন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডি.এল. রায়, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত — তেমনই ছিল কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আলী কুরেশি, জসীমুদ্দিন এমনকি ফারুখ আহমেদের গান। এঁদের মধ্যে অনেকেই বাঙালি মুসলমানদের পক্ষে উপনিবেশবিরোধী, রাজনৈতিক কবিতার জন্য বিশেষ পরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশ পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু কবিকে বেছে নিলো, যাঁর জন্ম জমিদার বংশে! সন্দেহ নেই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গুণীদের তালিকায় সর্বোচ্চ আসনে বিরাজমান ছিলেন নিজের প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার কারণেই। এও অস্বীকার করার জায়গা নেই বাংলার পূর্ব অংশের (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রতি কবিগুরুর প্রগাঢ় ভালবাসা ছিল — আপামর বাংলাভাষীকে ঐক্যবদ্ধ করে এমন বন্ধনের প্রতি তিনি ছিলেন সদাসচেষ্ট ও বিশেষভাবে আবেগপ্রবণ।
কিন্তু হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এসব তথ্য ও ইতিহাসের ধার ধরেন না। তিনি নিশ্চিত, এই দরিদ্র বাংলাভাষী অহমিয়া নাগরিকরা (যাদের সংখ্যা অসমে চোখে পড়ার মতো) 'সোনার বাংলা' গাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহেরই পরিচয় দিয়েছে।
আদতে, ভাষার রাজনীতি করার জন্য ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার আগে হিমন্তের প্রয়োজন নিজের সংকীর্ণ জ্ঞান ও শিক্ষার পরিসরকে আরেকটু বিস্তৃত করা এই বোধ আনার জন্য যে বাংলা গান-কবিতা (এবং সংস্কৃতি)-র বিশাল ভাণ্ডার বিশ্বব্যাপী। প্রত্যেক বাঙালির সম্পত্তি, তা সে বাঙালি পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, অসম, ত্রিপুরা, ব্রিটেন, নাইজিরিয়া যেখানেই থাকুক।
ভারত ও বাংলাদেশ দুটি দেশ নিজের মতো করে রবীন্দ্রনাথের দুটি গান তাদের 'জাতীয় সংগীত' হিসাবে ধার্য করেছে (যা একটি অভিনব ঘটনা কারণ পৃথিবীতে এমন উদাহরণ আর নেই), তার মানে এই নয়, একক ও ভিন্ন কম্পোজিশন হিসাবে এই গান দুটি অন্য দেশের কেউ গাইলে তা 'গুনাহ্'।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী যে গানের কথাগুলোয় জোর দিয়ে বলছেন তা বিস্বাসঘাতকতার সমতুল্য। একবার দেখে নেওয়া যাক। গানটির শুরুর পংক্তিগুলো এরকম —
'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বজায় বাঁশি।
ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,
মরি হায় , হায় রে
ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি।'
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত এই গানটি, দুই বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করার অভিপ্রায়ে। ব্রিটিশ বাহিনির প্রশাসনিক সুবিধার জন্য প্রস্তাবিত এই বিভাজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার জাতীয় ঐক্য ও হিন্দু-মুসলমান বিভেদ সৃষ্টি। ভাইসরয় কার্জনের নির্দেশে বাংলার পূর্ব অংশ বিভক্ত করে অসম প্রদেশের (১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত) সঙ্গে যুক্ত করা হয়, ঢাকা ঘোষিত হয় নতুন রাজধানী। বিপুল প্রতিবাদ সত্ত্বেও পূর্ব সিলেটের বিশাল ও জনবহুল বাংলাভাষী জেলাকে বলপূর্বক অসমের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়, ১৮৭৪ সালে। এরপর, ১৯০৫ সালে, লর্ড কার্জন নিশ্চিত করেন গর্জে ওঠা বাংলাকে 'সবক' শেখানোর একমাত্র উপায় — পূর্ববঙ্গীয় বাঙালিদের একটি বিশাল অংশকে অসমে পাঠানো। ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য, ব্রিটিশরা বাঙালি কৃষকদের অসমের উর্বর নদীতীরবর্তী অঞ্চলে বাসটি স্থাপনের জন্য উৎসাহিত করে। স্বাভাবিকভাবেই অহমিয়াদের রোষের মুখে পড়তে হয় বাংলার কৃষকদের (বিশেষ করে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের) যার আঁচ দেড় শতক পরও ধিকিধিকি জ্বলছে। প্রশ্ন: এতো বছর পর তারা যাবে কোথায়? কোনটা তাদের আপন দেশ — ভারত, অসম, না বাংলাদেশ! এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক কিছু বছর যাবৎ বহু বাংলাদেশি নাগরিক — মুসলিম এবং হিন্দু — উভয়েই অসমে অনুপ্রবেশ করেছে। ফলে কারা 'আদি' নাগরিক, কারা 'অনুপ্রবেশকারী' সেই হিসাব গুলিয়ে যাচ্ছে। এই ইতিহাসটুকু ঝালাই না করলে কেন অহমিয়ারা ভঙ্গুর জনসংখ্যার ভারসাম্য নিয়ে এতখানি উদ্বিগ্ন তা বোঝার উপায় নেই। অহমিয়াদের এই আতান্তর ও নিরাপত্তাহীনতাকেই নিরালস কৌশলে কাজে লাগাচ্ছেন হিমন্ত।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই পাঠকের কাছে পরিষ্কার — কেন কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী বাঙালিরা অসমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ? ১৯৮৩-তে মধ্য অসমের নেল্লিতে প্রায় ৩ হাজার বাঙালি মুসলিমের সাত ঘন্টার পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করার পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি অসম সরকার।
কবিগুরুর গান, যা এখন হিমন্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য, সেই সংক্রান্ত আলোচনায় নিজের উদ্ভট যুক্তির সমর্থনে তিনি তিনটি যুক্তি দেন। পয়লাতে, সামগ্রিক বাঙালিদের (পড়ুন বাংলাদেশি, না কি বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশি!) প্রতি তাঁর ক্ষোভের কারণ, তিনি কেন ইউনুস জমানার আগেও পড়শি দেশ বাংলাদেশকে 'শত্রু' বলে মনে করতেন, এবং সর্বোপরি তাঁর দলের প্রতি (পরোক্ষে অসমের প্রতি) তিনি কতখানি অনুগত।
সমস্যা হলো, গান্ধী ও ঠাকুরের অহিংসা, সহিষ্ণুতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বিশ্বভ্রাতৃত্বের দর্শন ধর্মীয় মৌলবাদের মূল চেতনার এতটাই বিরোধী যে, আরএসএস-বিজেপি যতই শাক দিয়ে মাছ ঢাকুক না কেন, গন্ধ ঠিক নাকে আসে। এদিকে মোদি-শাহ এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির তাবড় নেতা-মন্ত্রীরা স্বল্পজ্ঞানী 'ভক্ত' হয়েও রবীন্দ্রনাথের প্রশংসায় সর্বদা পঞ্চমুখ। বিশেষ করে তাঁদের রবীন্দ্রপ্রীতি জাগে রাজ্যে নির্বাচনের আগে, তবে কিনা পশ্চিমবাংলার সাধারণ মানুষ এখনও তাঁদের গুরুত্ব দেয় না। হিন্দু মৌলবাদের অন্যতম প্রবর্তক দিননাথ বাত্রাকে আমি তুলনায় 'সৎ' বলবো — কারণ তিনি ২০১৭ সালে আরএসএস-অনুমোদিত 'শিক্ষা সংস্কৃতি উত্থান ন্যাস'-এ সরাসরি আর্জি জানান, জাতীয় শিক্ষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পরিষদের (এন সি ই আর টি) সমস্ত পাঠ্যপুস্তক থেকে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের চিন্তাভাবনা বাদ দেওয়া হোক।
এটি সম্প্রতি, যোগী আদিত্যনাথও উত্তরপ্রদেশের দ্বাদশ শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক থেকে কবিগুরুর একটি বিখ্যাত ছোটগল্প সরিয়ে ফেলেছেন, তার জায়গায় নিজের এবং বাবা রামদেবের লেখা অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ভুললে চলবে না, হিন্দু ডানপন্থীরা কিন্তু লাগাতার ভারতের জাতীয় সংগীতকেও ছেড়ে কথা বলে না। উদাহরণ ২০১৫ সালে রাজস্থানের রাজ্যপাল কল্যাণ সিং বলেন, আমাদের জাতীয় সংগীতটি ‘anachronistic’ অর্থাৎ তা কালবৈষম্যমূলক। আবার কখনও গুজব ছড়িয়ে পড়ে — রবীন্দ্রনাথ ১৯১২ সালে ভারত সফরে আসা রাজা পঞ্চম জর্জের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে এ গান রচনা করেন।
যে কোনও মানুষ, যে বোধশক্তি রহিত নয়, জানে, মোদি বা সাভারকরের মতো সংকীর্ণ আদর্শ অথবা তাঁদের অকপট অসহিষ্ণুতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গান, মনন, চিন্তন কোনও কিছুরই সাদৃশ্য থাকা অসম্ভব। বিজেপির যে অসহিষ্ণুতা 'ইউ.পি.এ.', 'সি.এ.এ', 'এন.আর.সি'-সহ অন্যান্য মুসলিম-বিরোধী কার্যকলাপের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রকট।
'চিত্ত যাহা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,
যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে
উচ্ছসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়'
আদতে বাস্তব এটাই, যখনই ডানপন্থী উগ্রপন্থাদের হাতে অস্ত্র ফুরিয়ে আসে তখন ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি জিইয়ে রাখতে তারা বিকৃতি ও মিথ্যার শরণাপন্ন হয়। এ-কথা সার্বজনীন স্তরেই প্রযোজ্য। মনস্তত্বে 'বিগ লাই' (অতিকায় মিথ্যে) বলে একটি উপাত্ত আছে। যে-তত্ত্ব গোয়েবলস দিয়েছিলেন জার্মানিতে নাৎসিদের বিরুদ্ধে। এই ধারণার প্রতি গোয়েবলসের প্রকাশ্য সমর্থনে পাওয়া যায় তাঁর প্রবন্ধ ‘Aus Churchils Lugenfabrik’ ('ফ্রম চার্চিলস লাই ফ্যাক্টরি') থেকে, যা প্রকাশিত হয় ১৯৪৩ সালের ১২ই জানুয়ারি। ধারণাটির সারমর্ম এরকম অতিকায় মিথ্যা লাগাতার বলা গেলে অবশেষে এক সময় মানুষ তা বিশ্বাস করবে। ভিন্ন মত দমন করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পন্থা 'বিগ লাই'।
আসলে এসবই কৌশল হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, যোগী আদিত্যনাথ, এমনকি পশ্চিমবঙ্গের অতি-আক্রমণাত্মক বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর মতো উস্কানিদাতার আরএসএস-বিজেপি হাইকমান্ডের প্রতি নিজেদের আনুগত্য জাহির করার — দেশ তথা দলকে জানান দেওয়া — তাঁদের ধমনীতে বইছে খাঁটি গেরুয়া রক্ত। যোগী নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে গোঁড়া এবং ধর্মান্ধ। বাকি দুজন দলবদলু — তাই তাঁদের প্রমাণ করার তাগিদ আরও বেশি। দলের হাই প্রোফাইল নেতারা যখন এমনতর তোষামোদে মুখর, তখন কেন বিশ্ব শর্মার 'যুধ্যং দেহি' মনোভাব তা জলবৎ তরলং নয় কি? মুসলিম বা বাঙালির উপর কৌশলী নিপীড়ণ না চালালে দোলে মান থাকবে কী করে!
