বিশ্বকোষের মতন তাঁর মস্তিস্ক, সব খুঁটিনাটি মুখস্ত। আমি অবাক হয়ে তাঁর থেকে রাজ্যের নির্বাচনের রাজনীতির ব্যাপারে অনেক তথ্য ও ইতিহাস জানতে পারলাম।...তিনটি বা চারটি I-Pac এর চেয়ে বেশী খবর, তথ্য ও বুদ্ধি থাকত তাঁর মাথায়। আর সব সময় হাসি এবং সৌজন্য।
গেছে শুনে খারাপ লাগলো। আজ মনে পড়ল সেই ১৯৯৭ এর কথা।
আমি যখন দেখলাম রাজ্য সরকার আমায় আমার PhD Thesis এর কাজ শেষ করার জন্যে কিছুতেই ছুটি দিচ্ছে না (অন্যদের দিয়েছিল), খানিকটা রাগ করেই আমি রাজ্যের ট্যাক্স কমিশনারের উচ্চ পদ ত্যাগ করে ও রাজ্য সরকার ছেড়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক হয়ে চলে গেলাম। ভাবলাম সবে আগের বছর সংসদীয় নির্বাচন হয়েছে, অতএব আর কয়েক বছর কোনও নির্বাচনের ঝঞ্ঝাট নেই, কাজের চাপও কম থাকবে।
এই মনে করে আমি ভারতের তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (ডঃ এম এস গিল)এর অনুমতি নিলাম যাতে কাজের পর পড়াশুনা করার অবকাশ পাই। আর মাঝেমাঝে কিছু ছুটিও নিতে পারি। এই আশ্বাস নিয়ে আমি ওই CEO আপিসে যোগদান করলাম।
চেয়ারে বসার কিছুক্ষণ পরেই আমার প্রথম ভিজিটার হলেন মুকুল রায়। তিনি ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডান হাত। খুব সহজেই বুঝলাম যে অন্যদের তুলনায় মুকুল একজন অসম্ভব বুদ্ধিমান ব্যক্তি এবং স্পষ্ট কথা বলার লোক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের মতো সারা বাংলা ঘুরে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছেন। সকল কর্মী ও নেতাদের তিনি চেনেন, আর তাদের দোষ গুনের হিসাবও করে নিয়েছেন।
বিশ্বকোষের মতন তাঁর মস্তিস্ক, সব খুঁটিনাটি মুখস্ত। আমি অবাক হয়ে তাঁর থেকে রাজ্যের নির্বাচনের রাজনীতির ব্যাপারে অনেক তথ্য ও ইতিহাস জানতে পারলাম। ওঁর প্রতি আমার সম্মান বেড়ে গেল। মনে মনে ভাবলাম আমি সেন্ট জেভিয়ার্স ও প্রেসিডেন্সির, আর মুকুল রায় তো কাঁচরাপাড়ায় পড়েছেন, কিন্তু কত দক্ষ তিনি! অবশ্য কাঁচরাপাড়ায় তাঁর ইতিহাস নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়।
আমি শুধু অবাক হয়ে তাঁর গড়গড় করে বলা তথ্য শুনতাম। পরে মিলিয়ে দেখতাম যে উনি ১০০ শতাংশ ঠিক বলেছেন, কাগজ না দেখেই। আর মাত্র একজন এই রকম অসাধারণ স্মৃতিশক্তির ব্যক্তি দেখেছিলাম। তিনি অবশ্য মুকুলের তুলনায় অনেক বেশী পণ্ডিত মানুষ, তিনি প্রণব মুখোপাধ্যায়।
আমার গবেষণার কপালে সব সময় জুটে যায় মীর জাফর। যে কাজের জন্যে এই পদে এসেছিলাম তা তো হলই না, দু দুটি লোক সভা নির্বাচনের ঠেলা সামলাতে হলো দু বছরে। ১৯৯৮ আর ১৯৯৯। সাথে ভোটার তালিকা সংশোধন, ছাপা অক্ষর থেকে ৫ কোটি নামকে নতুন করে কম্পিউটারে আপলোড করা, ভোটার ID card তৈরি করা।
আর তাঁর লেগেই ছিল রাজনৈতিক দলের সাথে টানাপোড়ন। কখনও ভাল, কখনও মতবিরোধ, ঝগড়া। দু'জন মানুষকে কখনও রাগতে দেখিনি, এক অনিল বিশ্বাস আর একজন মুকুল রায়। বাকি সকলেই কমবেশি রাগারাগি করেছেন। চেঁচামিচিও। অনেকেই আবার গালাগালও দিয়েছে।
তিন বছর পর আমি ওই পদ ছেড়ে পালালাম, রাজ্যের শিল্প-বাণিজ্য সচিব হয়ে। মুকুল কিন্তু বরাবর যোগাযোগ রেখেছেন। উনি সৎ না অসাধু এই প্রশ্ন নিয়ে আমার আলোচনা নয়, এবং অর্ধ শতাব্দী ধরে রাজনীতি দেখার পর আমি জোর গলায় বলবো বেশীর ভাগ দলে সৎ লোক খুঁজে পাওয়া যায় না।
বাম আমলে অনেকেই হতভম্ব হয়ে যখন দেখত সরকারের প্রধান শত্রু দলের নেতা মুকুল রায় জহর সরকারের আপিস ঘরে সেটা চোখে লাগলেও, বামেরা আমায় কিছু বলেনি। এখন হলে তো সেই আধিকারিক কে নবান্ন থেকে সুদূর সুন্দরবনে তাড়িয়ে দিত।
২০০৬ এ তৎকালীন বাম সরকারের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মনোমালিন্য হওয়ায়, আমি দুঃখ করে কলকাতা ছেড়ে (বউ বাচ্চা আর ট্রাঙ্ক নিয়ে) চলে গেলাম দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের অতিরিক্ত সচিব হয়ে। অনেকেই আমার সঙ্গ ছাড়ল, বিভিন্ন কারণে বা অকারণে।
কিন্তু মুকুল নয়। তিনি রাজ্য সভায় তৃণমূলের বড় নেতা, তাও যখন ইচ্ছে ফোন করে চলে আসতেন। শুধু গল্প আর জল্পনা করতে। এসেছিলেন আমার সংস্কৃতি সচিবের দপ্তরে আর তারপর প্রসার ভারতীর অফিসে। দেখলাম আরও দক্ষ আরও বুদ্ধিমান হয়েছেন আর অনেক দায়িত্ব বহন করছেন। কিন্তু সেই এক ঠান্ডা মাথার মাস্টার ব্রেন ।তিনটি বা চারটি I-Pac এর চেয়ে বেশী খবর, তথ্য ও বুদ্ধি থাকত তাঁর মাথায়। আর সব সময় হাসি এবং সৌজন্য। ওঁর পরের প্রজন্মের নেতাদের অহংকার আর অতিচালাকি (সাথে লেঙ্গি মারার চেষ্টা) দেখে হাসতাম। তারা মুকুলের অনেক পরে তৃণমূলে এসেছে কেরিয়ার করতে আর কিছু পেতে।
পরে দেখলাম মুকুলকে কী ভাবে দলের মধ্যে কোণঠাসা করা হলো আর ভাগানো হলো। আর দেখলাম ওঁর পালটা চাল, বিজেপিকে কী ভাবে কত কত আসন পাইয়ে দেওয়ার। অনেক রাজনীতির গল্প হয়ে যাচ্ছে, তাই এখানেই থামি।
শেষ জীবনে ওঁর যখন মানসিক আর শারীরিক কারণে প্রচণ্ড ভুগতে হচ্ছিল তখন যথেষ্ট দুঃখ হত। মনে হত সবই তাঁর কপাল আর নোংরা পলিটিক্স। এই সব বলে আমার কোনো লাভ তো নেই, কিন্তু সত্য তো সত্যই থাকবে। হয়তো কিছু মানুষের এই কথাগুলো জ্বালা ধরাবে।
আমি প্রার্থনা করি ওঁর আত্মা যেন এখন শান্তি পায়।
