এই শিউলি ফুল দেখে আমার একটা বড় দুঃখের কথা মনে পড়ল। আমি সারা জীবনের কোনও দিন গ্রামে মাটির বাড়িতে থাকিনি, পুকুরে স্নান করিনি, মাছ ধরিনি, গাছ থেকে মনের আনন্দে ফুল আর ফল তুলিনি। আমাদের গ্রাম ওপারে — এখন আর গ্রাম বলা যায় না, উপ শহর — পাকা রাস্তা, পাকা বাড়ি, আলো পাখা, ইত্যাদি। বাবা ১৯৭১এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর গ্রামে গিয়ে একেবারে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। সব এত ভয়ঙ্কর ভাবে বদলে গেছে — ভাল তো লাগলো কিন্তু বেদনা, প্রচুর ব্যথা পেয়েছিলেন — আরও গভীর। তিনি আর জীবনে কোনও দিন গ্রামে ফেরেন নি।

এপারে জেলায় কাজ করার সময় আমি কোথাও এক রাত এর জন্য, আমার মনের মতো গ্রামে থাকিনি। গ্রাম কী, তা প্রাণ দিয়ে কখনও উপলব্ধি করার সুযোগ হয় নি হয়নি। হ্যাঁ, প্রত্যন্ত গ্রাম দেখেছি, অনেক বার দিন কাটিয়েছি — ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে সভা করেছি আর তারপর ফিরে এসছি।

আমায় যে কজন বন্ধু পুজোতে তাদের দেশের বাড়িতে ডেকেছে বা নিয়ে গেছে, সবই কিন্তু আসলে যথেষ্ট সম্পন্ন পরিবারের। যদিও বলা হয় তাদের গ্রাম কিঞ্চিৎ মফঃস্বলএ অবস্থিত, তাদের বাড়ি কিন্তু বড় আর পাকা। সেই আদি মাটির ঘরের গ্রাম তো নয়ই। আলো পাখা জল বাথরুম সবই ছিল।

হ্যাঁ, এই শিউলি ফুল দেখে মনে পড়ল খুব ছোট বেলায় প্রায় মুছে যাওয়া একটি স্মৃতি। বাবা আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন আসামের ধুবড়িতে, তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাড়িতে। শহরের কাছে, কিন্তু পাড়াটি ছিল একেবারে গ্রাম্য। বাবা মা এখন বেঁচে নেই তাই ওঁদের জিজ্ঞেস করতে পারছি না ঠিক কোন সাল ছিল। যত দূর মনে পড়ে আমার বয়েস ছিল সাত বা আট। আমার দুই ভাই তো আরও ছোটো আর এক বোন তো একেবারেই কোলের বাচ্চা।

বাড়িটা পাকা কিন্তু বাতি খুবই টিমটিমে — যখন তখন চলে যেত। বিদ্যুতের পাখা বোধহয় দুটি ঘরে ছিল, আমাদেরটায় ছিলনা তা আমার মনে আছে। জানালা খুলে মশারি টানিয়ে শুতাম। ভালোই হাওয়া আসতো। বন্ধ হয়ে গেলে সুন্দর দুটি হাতপাখা ছিল — যা চালানো নিয়ে আমার মেজ ভাই সব সময় ঝগড়া করত। আর সবচেয়ে মজা লাগত ওই কেরোসিনের বাতি।তার সেই বিশেষ গন্ধ জীবনেও ভুলিনি।

অন্ধকারে আমি আর মেজো ভাই বাকি দুই কচি কাচাঁদের কচিকাঁচাদের ভূতের ভয় দেখতাম। রাতে ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ আর ব্যাঙের ডাক অন্য দুনিয়াতে নিয়ে যেত। কখনও বা দূরে শিয়ালের হুক্কা হুয়া। আবার মনে হত ওই বোধহয় বাঘের ডাক! ভয়ের — কিন্তু কী দারুণ মজা।

ওখানে আমার দুই বন্ধু জুটে গিয়েছিল — আমার সমবয়েসী খোকন আর তার বকবকে দিদি। ওরা পাশেই থাকত, এক কুঁড়েঘরে। ওই আমার স্বপ্নের ঘর। মাটির দেওয়াল আর খড়ের ছাত। ছোট্ট এক দরজা আর বেশ ওপরে একটা আরো ছোট জানালা। মাঝে তিনটি বাঁশের কঞ্চি। ওদের বাবা আমার বাবার বন্ধুর ওই বাড়িটির দেখাশোনা করত আর মা সেখানে রাঁধত।

ওরা আমায় নিয়ে ওদের সারা সাম্রাজ্য দেখাত। ওরা চলতো খালি পায়ে, আমার ছিল চটি। লাফিয়ে লাফিয়ে, নাচতে নাচতে হাঁটতাম — বড়দের মতন পা টিপে টিপে না। কত গাছ চিনত আর এত নাম শুনে আমার মাথা গুলিয়ে যেত। ওখানেই আমি প্রথম লম্বা গাছে উঠতে শিখলাম।

সবার হাতে ছিল ছড়ি বা বেত, যা দিয়ে পাশের ঝোপঝাড় কে মারতে মারতে চলতাম। ওরা আমায় বলতো কোথায় সাপের বাসা, কোন গাছে বাদুড় উল্টো ঝুলতো আর কোথায় ভিমরুলের বড় চাক। হাতের গুলতি ছটফট করলেও ওরা না বাদুড় না ভিমরুলের চাকে গুলি মারতে দিত।

পুকুরে নামা আমার একদম নিষেধ ছিল আর দিদি বলেছিল নিয়ম ভাঙলেই নালিশ করবে। তা সত্ত্বেও একদিন যখন দিদি ইস্কুলে গিয়েছিল, ওই খোকন আমায় একটা গামছা পরিয়ে হাত ধরে পুকুরে নামালো। আমি তো বার বার পিছলে পড়ে যাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল পায়ের তলায় শক্ত জিনিস আঘাত করছে। ছেলেটি এক ডুব সাঁতার দিয়ে গেঁড়ি গুগলি বার করে হাতে দিল। ম্যাগো! ওই ছোট প্রাণী গুলি আমার হাতে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল — তাই ছিটকে ফেলে দিলাম। খোকন না ধরে থাকলে পুকুরে হড়কে পড়তাম। ও আবার গামছায় ছোট দুটি মাছও ধরে দেখালো। আমি ওর আদেশে একবার জলে ডুব দিলাম। কেমন যেন চোখে স্পষ্ট দেখতে পারলাম না আর জলে দম বন্ধ হয়ে গেল। বড়রা দেখার আগে তাড়াতাড়ি পুকুর ছেড়ে উঠে, আবার শার্ট আর হাফ প্যান্ট পরে নিলাম।

এবার সবচেয়ে মজার কথায় আসি। রোজ ভোরে ওই ভাই বোনেরা আমায় ডাকতে আসতো — ফুল কুড়াতে যাওয়ার আগে। আমি চটি ফেলে ওদের মতন হিমে ভেজা ঘাসে লাফিয়ে চলতাম। অত সকালের আমেজই আলাদা।দিদির সাথে থাকত তার এক বন্ধু। এই ফুলের ব্যাপারে খুবই পাকা ছিল। শিউলি গাছের গোড়ায় কত কত ফুল পড়ে থাকত। ওই দৃশ্য আমি এখনও ভুলিনি।

আঃ কী সুন্দর হালকা মিষ্টি গন্ধ। একটা একটা করে তুলে ওদের তারের ডালা বা ঝুড়িতে ফেলতাম। “ওটা তুলিস না - ওটাতে পিঁপড়ে” কত জ্জ্ঞানই পেতাম। ওরাও একটু উত্তক্ত হতো এই বোকা ক্যাবলা শহুরে ছেলেটাকে নিয়ে। ঠিক করে ফুলও তুলতে জানেনা।

তারপর শুরু হতো মালা গাঁথা। ওখানে তো ওই দুই দিদি আমাদের হাতই লাগাতে দিত না। তারাই নাকি সব জানে — ছুঁচে সুতো গলাতে, তার পর টপ টপ করে একটা একটা ফুল ছুঁচ দিয়ে গেঁথে নিতে।

খোকন আর আমি ওদের ভেংচি কেটে বাঘ সিংহ শিকার করতে যেতাম। তা তো ওই ভীতু দিদিরা কোনদিনই ভয়ের চোটে পারবে না।

কিন্তু আজ অব্দি ওই মাত্র কয়েকটি সুমধুর দিনগুলি ভুলিনি। মাঝে সাঝে মনে হয় ওদের কথা। সব ভাল আছে তো? ইচ্ছে হতো ওদের একবার বলতে - “আমি না বড় হয়ে আর ক্যাবলা নেই।”

স্মৃতি আর শিউলি কোথায় যেন এক সাথে মাথায় গেঁথে আছে।

No comments on 'স্মৃতি আর শিউলি গাঁথা'

Leave your comment

In reply to Some User