একথা মনে রাখা দরকার, বিধান রায়ের শক্তির নেপথ্যে ছিল তাঁর পেশাগত দক্ষতা— রাজনৈতিক নেতা নয়, চিকিৎসক হিসাবে।...বিধানচন্দ্রের দখলে ছিল রেকর্ড সময়ে পরপর (দু’বছর তিন মাস) দু’টি অতি মূল্যবান ডাক্তারি ডিগ্রি— এমআরসিপি ও এফআরসিএস— অর্জন করার বিরল কৃতিত্ব — ভারতে ও বিলেতে । ফলে চিকিৎসক হিসেবে তাঁর সম্মান ছিল অনতিক্রম্য।

১ জুলাই এ আশ্চর্য লাগে যখন দেখি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় পৃথিবীতে তাঁর প্রবেশ ও প্রস্থানের এই দিনটিকে এক রেখে, কীভাবে ঠিক আশি বছর বয়সে নিজের বিদায়-মুহূর্তটিও বেছে নিয়েছিলেন।

তিনি যখন বাংলার দায়িত্ব নেন, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো তখন সবে দানা বাঁধছে একটু একটু করে । ফলে রাজ্যস্তরে অনেক কিছুই খানিকটা নড়বড়ে, সান্দ্র অবস্থায় ছিল। ভারতের মতো বিপুলায়তন, অগণিত বৈচিত্র্য এবং বিবিধতার দেশকে ঐকিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় (Unitary System of Governance) শাসন করা প্রায় অসম্ভব ছিল ।

অবশ্য এই ব্যবস্থাতেই জওহরলাল নেহরু ‘ফার্স্ট অ্যামং ইক্যুয়ালস’ হিসেবে নিজের উদারপন্থী-গণতান্ত্রিক ইমেজ তৈরি করেছিলেন এবং সেটা পরিস্থিতির সঙ্গে বেশ খাপ খেয়ে গিয়েছিল। তিনি নিজগুণে অন্যান্য নেতৃবর্গের তুলনায় অনেকটা উঁচুতে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেছিলেন।

কিন্তু ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের ব্যাপারটা খানিকটা অন্যরকম ছিল। যে ক’জন মুষ্টিমেয় প্রাদেশিক নেতা নেহরুর ব্যক্তিত্বের সামনে অবিচল থাকতেন এবং নিজেকে ক্ষুদ্র বোধ করতেন না, বিধানবাবু ছিলেন তাঁদের অন্যতম । তিনি যখন বক্তৃতা করতেন, সাধারণ মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তা শুনত, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি নাম ধরে সম্বোধন করছেন, এমনকী ‘পণ্ডিতজি’ বলেও নয়। সেই আন্তরিকতা, সেই বিশ্বাস ও সৌহার্দ্য হয়তো এ দেশ আর ফিরে পাবে না।

একথা মনে রাখা দরকার, বিধান রায়ের শক্তির নেপথ্যে ছিল তাঁর পেশাগত দক্ষতা— রাজনৈতিক নেতা নয়, চিকিৎসক হিসাবে। নেহরুর বাবার আমল থেকে ওই পরিবারের চিকিৎসক ছিলেন বিধানচন্দ্র । চিকিৎসা করেছেন স্বয়ং গান্ধীরও। ফলে সেই ক্ষমতাবলেই যখন তখন নেহরুর ঘরে অনায়াস যাতায়াত ছিল তাঁর। তার উপর বয়সে বিধানচন্দ্র ছিলেন নেহরুর চেয়ে বছর সাতেকের বড়। দু’জনেই একই সময় পড়াশোনা করেছিলেন বিলেতে। বিধানচন্দ্রের দখলে ছিল রেকর্ড সময়ে পরপর (দু’বছর তিন মাস) দু’টি অতি মূল্যবান ডাক্তারি ডিগ্রি— এমআরসিপি ও এফআরসিএস— অর্জন করার বিরল কৃতিত্ব — ভারতে ও বিলেতে । ফলে চিকিৎসক হিসেবে তাঁর সম্মান ছিল অনতিক্রম্য।

ব্যারিস্টার নেহরুও বিধানচন্দ্রের কৃতিত্বে মুগ্ধ ছিলেন, কিন্তু তাঁকে রাজনীতিতে আসার জন্য রাজি করাতে পারেননি তিনি । তখন পুরোদমে ডাক্তারি করে চলেছেন বিধান রায়। শেষে ১৯২৫ সালে প্রথম ভোটে দাঁড়ালেন তিনি — ব্যারাকপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। এবং হারালেন ‘দ্য গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান অফ বেঙ্গল’ রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে । সেই সময়ের সবচেয়ে উঁচুমাপের নেতা ছিলেন তিনি ।

এছাড়া ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ, তাঁর সঙ্গে ছিলেন যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত আর সুভাষচন্দ্র বসু।কিন্তু এই অধ্যায়ে সুভাষকে ব্রিটিশ সরকার বারবার জেলে পাঠাচ্ছিল। তাই গান্ধীর ডাকে বিধানচন্দ্রকেই অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হল। তাঁর কর্মকুশলতায়, সাফল্যে মুগ্ধ হয়ে মতিলাল নেহরু তাঁকে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হিসেবে মনোনীত করলেন। আর এরপরেই তাঁকে কলকাতা পুরসভার মেয়র পদে‌ বসানো হল। তখন নেতাজি সুভাষচন্দ্র জাতীয় কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য । তিনি থাকার সময়েই বাংলার প্রদেশ কংগ্রেসের দলাদলি আর গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সফলভাবে সামলালেন বিধানচন্দ্র ।

সুভাষচন্দ্রের চেয়ে বিধানচন্দ্র ছিলেন পনেরো বছরের বড়। কিংবদন্তি ডাক্তার হওয়ার পাশাপাশি বিধানচন্দ্র ছিলেন রাজনীতির পাকা কৌশলী । ফলে গান্ধী বনাম প্রদেশ কংগ্রেসের তাত্ত্বিক বিরোধে সরাসরি যোগ না-দিয়ে তিনি সচেতনভাবেই নিরপেক্ষ অবস্থান নিতেন। ১৯৩৭-এর পর ফজলুল হকের বাংলা মুসলিম-শাসিত রাজ্য হলেও তার আর্থ-সামাজিক লাগামটা ছিল ইংরেজি-শিক্ষিত, উচ্চবর্ণের হিন্দু ‘ভদ্রলোক’-দের হাতে। একই সময়ে, ১৯৩৮ সালে (এবং ১৯৩৯-এও) সুভাষচন্দ্র যখন কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন, ততদিনে ‘অ-বিভক্ত বাংলা’-র দৃঢ় ধারণাটিতে চ্যুতিরেখা দেখা দিতে শুরু করেছে। এমনকী স্বাধীনতার দু’মাস আগে পর্যন্ত বাংলার কোনও নেতা নিশ্চিতভাবে জানতেন না, এ রাজ্যের ভাগ্যে কী লেখা আছে।

মুসলিম লিগের দাবি ছিল— বাংলা বা তার বৃহত্তম অংশ (অবশ্যই কলকাতা-সহ) নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হোক। হিন্দু মহাসভার তত সমর্থন না থাকলেও (মাত্র এক বিধায়ক) লাগাতার সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পক্ষে সওয়াল করে চলেছিল — যা ছিল তাঁদের সর্বভারতীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। সুভাষচন্দ্রের দাদা শরৎচন্দ্র বসু এবং মুসলিম লিগের প্রাক্তন প্রধান হাসান সোহরাওয়ার্দীর উদ্দেশ্য ছিল বাংলার হিন্দু-মুসলমান ঐক্য অক্ষুণ্ণ রাখা আর এক স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়া হোক। আর কংগ্রেস তখন দ্বিধায় ভুগছিল — দেশ বিভাগ চাইছিল না, কিন্তু বুঝতে পারছিল এটি ব্রিটিশ আর লিগ না করে ছাড়বে না।

দ্রুত দেশভাগ নিশ্চিত করার উপায় হিসেবে মহম্মদ আলি জিন্না একরকম জোর করে ১৯৪৬ সালে বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগালেন। আর ১৯৪৭ এ দেশ ভাগও হল। অবশ্য প্রদেশ কংগ্রেসের ক্ষমতাবান হিন্দু নেতৃত্বের মূল ঘাঁটিই ছিল পূর্ব পাকিস্তান। দেশভাগের পর তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই ছিন্নমূল এবং দিশেহারা হয়ে পড়লেন।

বিধানচন্দ্রের পূর্বসূরি, বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ স্বয়ং ছিলেন পূর্ববঙ্গীয় এবং বাঙালি হিন্দুদের দেশভাগের গভীর যন্ত্রণাময় আবেগের শরিক। প্রদেশ কংগ্রেসের সবচেয়ে শক্তিশালী উপদল ‘হুগলি’-র নেতাদের তাঁর কার্যকলাপ পছন্দ হচ্ছিল না। তখনই মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে বিধানচন্দ্রের মনোনয়ন হয়। তিনি ছিলেন প্রবাসী বাঙালি, ফলে এই অতি-সংকীর্ণ ঘটি-বাঙাল দ্বন্দ্ব যে তাঁকে প্রভাবিত করবে না, তা বলাই বাহুল্য।

এর সঙ্গে ছিল নেহরুর প্রিয়পাত্র হওয়ার সুবিধাও । কিন্তু একই কারণে বিধানচন্দ্রকে মাঝেমধ্যেই নেহরুর অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে হচ্ছিল। ফলে একদিকে যেমন ‘দুর্গাপুর স্টিল প্লান্ট’ তৈরি করে আসানসোল-দুর্গাপুর-রানিগঞ্জকে নিজের স্বপ্নের প্রজেক্ট ‘ভারতের রুঢ়’ (Ruhr of India) হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন, অন্যদিকে তেমনই আবার নেহরুর ‘ফ্রেট ইক্যুলাইজ়েশন’ নীতির চোঁয়া ঢেকুর গিলতে গিয়ে পূর্বভারতের শিল্পবান্ধব অবস্থানের সুবিধে কিছুই নিতে পারেননি।

এই কেন্দ্রীয় ভর্তুকির ফলে ভারতের যে কোনও অঞ্চলে স্থাপিত কারখানা বাংলা-ওড়িশার খনিজ সম্পদ পাবে বাংলার দামেই। কিন্তু পশ্চিম ভারতের তুলো বা অন্য কোনও কাঁচামাল বাংলায় নিয়ে আসতে হলে চড়া রেল বা সড়ক পরিবহণের খরচ হত । ফলে বিধানচন্দ্র রায়ের আমল থেকেই পশ্চিমবঙ্গ শিল্পক্ষেত্রে ক্রমশ মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যগুলির কাছে পিছিয়ে পড়তে থাকে। তৎসত্ত্বেও বিধানচন্দ্র কেন্দ্রের কাছে নিজের বিরুদ্ধমত লাগাতার প্রকাশ করে গিয়েছেন — যা আজকের যুগে অকল্পনীয়। এবং নেহরু সরকারের কাছ থেকে বাংলার উন্নতির টাকা এনে তৈরি করলেন দু’টি উল্লেখযোগ্য উপনগরী— কল্যাণী এবং বিধাননগর। এছাড়া গড়ে তুললেন অশোকনগর-হাবড়া, যেখানে বসবাসের সুযোগ পেল অসংখ্য উদ্বাস্তু পরিবার।

বাস্তবে মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উদ্বাস্তু সমস্যা। এ ব্যাপারে কেন্দ্রের সহযোগিতা তিনি যে খুব একটা পেয়েছিলেন, তা নয় । দিল্লি তখন হিমশিম খাচ্ছে পঞ্জাব থেকে ভারতে আসা উদ্বাস্তুদের নিয়ে । চার বছরে ৭৩ লক্ষ হিন্দু এবং শিখ উদ্বাস্তুরা ভারতে এসেছিল । ১৯৬২ সালে বিধানচন্দ্রের প্রয়াণের সময়ে বাংলায় উদ্বাস্তুদের সংখ্যা সাড়ে বিয়াল্লিশ লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছিল । কিন্তু নেহরু সরকারের থেকে তেমন কোনও সাহায্য পাননি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী । ফলে নিরুপায় বিধানচন্দ্র পরিষ্কার বললেন, ‘হিন্দুরা পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে আসবেন না। খুব খারাপ অবস্থায় পড়বেন এবং আমাদের পক্ষেও তাঁদের জন্য কোনওপ্রকার ব্যবস্থা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’

নেহরু বার বার বলেছিলেন বাংলায় একটা ধর্মনিরপেক্ষ আবহাওয়া আছে, তাই বাংলা এইসব সমস্যা সামলে নিতে পারবে । এদিকে বাংলার পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত এবং বিস্ফোরক হয়ে উঠছিল । কিন্তু এই অবস্থা ক্রমাগত অস্বীকার করে যান নেহরু এবং কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব । তাঁরা বিধানচন্দ্রকে পাল্টা চাপ দিতে থাকেন । এর ফল- ১৯৪৯ সালে কংগ্রেস কলকাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপনির্বাচনে হেরে যায়। ছিন্নমূল উদ্বাস্তুরা তখন মাথার উপর ছাদ আর পায়ের তলায় মাটির জন্য অধৈর্য হয়ে উঠেছে । কলকাতা শহর এবং লাগোয়া এলাকায় যেসব ফাঁকা জমিজায়গা ছিল (ব্যক্তি-মালিকানাধীন এবং খাসজমি), সেগুলি দখল করছে ।

এইরকম একটি গুরুতর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেই বাংলায় কমিউনিস্টদের উত্থান ঘটেছিল । বিধানচন্দ্র রায় ‘উদ্বাস্তুদের ছড়িয়ে দেওয়া’র নীতি ঘোষণা করলেন। ক্যাম্প থেকে শুরু করে পার্ক, এমনকী রাস্তায় ফুটপাথ থেকে উদ্বাস্তুদের তুলে নিয়ে গিয়ে পুনর্বাসন দেওয়া হল অন্যত্র । এই পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা নিষ্ফল হল। আর এর পরিণতি- খাদ্য সঙ্কটের সূচনা ।

১৯৫৯ সালের অগস্ট মাসে কমিউনিস্টরা ‘খাদ্য আন্দোলনে’ নামলেন । বাংলার ইতিহাসের মোড় ঘুরতে থাকে এই সময় থেকেই । প্রতিবাদী বামপন্থীদের উপর শাস্তির খাঁড়া নেমে আসে । ১৯৫৩ সালের ‘এক পয়সা ট্রাম ভাড়া’ আন্দোলন এবং ১৯৫৪ সালের ‘শিক্ষক আন্দোলন’ কমিউনিস্টদের পায়ের তলার জমি অনেকখানি শক্ত করেছিল। পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন অনেক বিক্ষোভকারী।

আবার একই সঙ্গে বিধানচন্দ্রের কড়া দমননীতির কথাও ইতিহাস বিস্মৃত হতে দেয়নি। তবে শক্তিশালী বিরোধী হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির অবদানের কথা বিধানচন্দ্রকেও স্বীকার করতে হয়েছিল। বিশেষত, জ্যোতি বসুর প্রতি তাঁর মুগ্ধতা এবং প্রশংসা তিনি কখনও গোপন করেননি।

কাজেই একথা ভেবে অনেকেই আশ্চর্য হন যে কংগ্রেস বিধানচন্দ্র রায়কে প্রায় ভুলে যেতে পেরেছে আর ১৫ বছরে শাসকদল তৃণমূলও বিধানচন্দ্র রায়কে সম্মান দেওয়ার ধারপাশ দিয়ে হাঁটেনি । কিন্তু তাঁকে মনে রেখেছেন বাংলার বামপন্থীরাই, যাঁরা বিধান রায়কে ‘আধুনিক বাংলার রূপকার’ খেতাব দিয়েছেন ।