"জহর, আমি একটা মারওয়াড়ি কোম্পানিতে কাজ করি, কিন্তু লিখি বাঙ্গালিদের জন্য, আর গপ্পো করি তোমাদের মতো বঙ্গসন্তানদের সাথে যারা প্রথমে বাঙ্গালিদের খাবার বোঝে আর তারপর বাংলার সংস্কৃতি। রতন রতন কে বোঝে, তাই না? "
এমনটাই বলেছিলেন শঙ্কর, মণি শঙ্কর মুখোপাধ্যায়। তাঁর ওই 'রতন'এর উল্লেখটা আমাদের দুজনের নাম নিয়ে সেটি বুঝতে আমার মিনিট দু-এক সময় লেগেছিল।
শঙ্করের মতন কিংবদন্তী লেখককে আবার তাঁর প্রজন্মের অনেক সাহিত্যিক তাঁদের একজন বলে মানতেনই না। কিন্তু তাতে শঙ্করের কিছু যায় আসেনি। তিনি দিব্যি তাঁর সরল কিন্তু সমৃদ্ধ ভাষায় জমিয়ে তুলতেন যে কোনো গল্পকে।
মণিদা হাওড়াকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন এবং হাওড়া নিয়ে তাঁকে খোঁচা দিলেই, ব্যাস। শুরু হয়ে যেত তুলনা, ইতিহাস, সভ্যতা, খাওয়া দাওয়া আর কত মজার আর অজানা কাহিনি। বিতর্ক অবশ্যই ভীষণ জমে উঠত।
তিনি চলে যাওয়ায় তাঁর অগুনতি পাঠকেরা খুবই দুঃখিত, কিন্তু আমার কেমন জানি মনে হয় তিনি এই অনিবার্য বিদায়ের জন্যে ক'বছর ধরে প্রস্তুত ছিলেন।
কলকাতা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনের হেড আপিস থেকে অবসর নেওয়ার অনেক পরেও সেখানে যেতেন। তিনি ছিলেন ওখানকার জন সংযোগ বা পাবলিক রিলেশনসের প্রধান। দেখতাম তিনি প্রায় প্রত্যেকদিনই ভিক্টোরিয়া হাউসে তাঁর অফিসে যেতেন।
তিনি কলকাতার প্রাণের কেন্দ্রবিন্দুতে বা কেন্দ্রস্থলেই থাকতে চাইতেন -- শহরের মানুষের জীবন, সংগ্রাম, প্রতিবাদ, আশা, স্বপ্ন এবং দুঃখের মাঝে থাকতে চাইতেন।
একবার তাঁর অফিসের ঠিক পাশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি প্রতিবাদ সভার তিনি আমায় চলমান ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন।
যদিও তিনি বালিগঞ্জের একটা 'পশ' এলাকায় থাকতেন, মণি-দা কিন্তু একজন খাঁটি মধ্যবিত্ত বাঙালি হিসেবেই রয়ে গিয়েছিলেন। তিনি জল আর চা ছাড়া কিছুই পান করতেন না -- কোনো দোষ-টোষ ছিল না। একটু বেরসিক করে তুলেছিল তাঁকে ঠিকই কিন্তু তাঁর তীক্ষ্ণ চোখ, টগবগে মস্তিষ্ক এবং দক্ষ হাত দিয়ে তিনি তাদের গল্প লিখতে পারতেন যারা যতসব রঙ্গিল, রোমাঞ্চকর বা অখ্যাতিপূর্ণ জীবন যাপন করত।
মণিদার র্সবদা আনন্দিত চিত্ত, মুখে হাসি আর ঠাট্টার মেজাজ ভুলব না। সত্যিই।

No comments on 'মণি শঙ্কর মুখোপাধ্যায়'

Leave your comment

In reply to Some User