তৃণমূল সরকারের দুর্নীতি, দাদাগীরি আর রাজ্যে অর্থনৈতিক অবনতির বিরুদ্ধে সত্যই এক বিশাল জনরোষ খুবই প্রবল ছিল। তাই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যাঁরা পছন্দ না করলেও ওই দলকেই ভোট দিয়ে এসেছে, সাম্প্রদায়িক দল কে আটকাবার জন্য, তাঁরা উত্তক্ত হয়ে বিজেপির পক্ষে ঝুঁকেছেন। ... শিক্ষিত যুবকদের কৈশোর থেকে যৌবন শুনতে হয়েছে মোদির পাঁচালী আর তাঁর আশ্বাস।... তাঁরা ভোট দেবেন না কেন, স্লোগানেই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন?

পশ্চিম বঙ্গ এখন ভারতীয় জনতা পার্টি শাসিত রাজ্যে। আশা আসংখ্যার নতুন দোলাচল। অনেকে মনে করছেন বাংলার এখন কিছু উন্নতি হতে পারে। শিল্প, বিনিয়োগ আর চাকরির যে অকাল চলছিল তার এখন কিছু না কিছু সুরাহা হতে পারে। আমাদের ছেলে মেয়েরা বেকারত্বের হাত থেকে বাঁচলেও বাঁচতে পারে।

একই সাথে সংখ্যালঘুদের ওপর এক ঘোর কালো ছায়াও দেখা দিয়েছে। ভয পাচ্ছেন তারা, সঙ্গত কারণে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও সমর্থকদের মাঝেও দুঃখ থেকে বেশি আশঙ্ক/আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুরু হয়ে গেছে ভাঙচুর — কখনও দলের আফিস বা ডেরায়, কখনও বা বাড়িতে বা সম্পত্তিতে। মুখ্যমন্ত্রী পদে অভিষেকের আগেই শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সচিবকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হল। খুবই রহস্যজনক ও পূর্বপরিকল্পিত ভাবে। ঘটনাটি নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে। এ ছাড়াও বেশ কিছু মৃতুর খবর মিলেছে। এমনও শোনা গিয়েছে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী যাওয়ার পর, আরও হিসাবনিকাশ হবে। প্রসঙ্গত ২০২১ সালের নির্বাচনের পরও তাই হয়েছিল — বিজেপি সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে যা খুব বেশী করে দেখিয়েছিল।

এদিকে ভারতে এক উত্তপ্ত বিতণ্ডা চলছে : এই জয় পরাজয়ের জন্য নির্বাচন কমিশনের হাত আছে কী না। ৭৫ বছরের সুশৃঙ্খল ভোটার তালিকার সংশোধন প্রণালী ভেঙে এবার এক নুতন জটিল পদ্ধতি প্রবর্তন করা হলো, যার নাম বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR এসইআর। ভোটার তালিকা কে 'পরিষ্কার' বা বিশুদ্ধ করার জন্যে ডানদিক বা বাঁদিক নাম কাটা হলো। কখনও বলা হলো এগুল নাকি ম্যাপিং-এর সুবাদে, অন্য স্তরে জানানো হলো এ সব বিচারাধীন (আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন) যার জন্য কোটির বেশি লোককে বলা হল লাইনে দাঁড়িয়ে বিরক্ত আমলাদের সামনে প্রমাণ করুন যে আপনি আপনিই। স্বাধীনতার পর ভারতের নাগরিকদের ভোট অধিকার প্রয়োগ করার জন্য এত হয়রানির সম্মুখীন হতে হয় নি।

মনে পড়ে অনেক ইতিহাস। প্রথম মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার (সিইসি) সুকুমার সেনের নির্দেশে অফিসাররা ঘরে ঘরে গিয়ে কত কাকতি মিনতি করে নাগরিকদের ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত করেছিলেন। তার পর এটাই মোটামুটি রেত্তয়াজে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ২৩ জন সিইসি, যার মধ্যে ছিলেন এস পি সেন বর্মা, পেরি শাস্ত্রী, টি এন শেষন আর জে এম লিংডোহর মতন কিংবদন্তি সবাই এই পদ্ধতি পালন করেছেন। ২৫ তম সিইসি অবশ্য সেই পরিচিত পথে হাঁটেন নি। তিনি যে নিয়ম চালু করেছেন তাতে ভোটার হতে গেলে বা তালিকায় নাম রাখতে গেলে এক বৃহৎ সংখ্যার নাগরিকদের প্রচুর যন্ত্রণায় ভোগা ছাড়া গতি নেই।

একচল্লিশ বছর সরকারে (যার ৪ বছর নির্বাচন কমিশনে) আমার দ্রিড় বিশ্বাস এই এসইআর সরকারি প্রকল্প নয় — এটি উচ্চমানের কর্পোরেট উকিল ও কৌশল-উদ্ভাবকদের তৈরি অস্ত্র। এ বারের কম্পিউটারের প্রোগ্রাম বা সোর্স কোড কাউকে বলা হয় নি। তবে এটুকু বোঝা গিয়েছে যে এই প্রোগ্রাম নাম-চেনা নিয়ে মোটেই নিরপেক্ষ নয়। কিছু বিশেষ ধরনের নাম চিনে নিতে তা বাদ দিতে জান। এর ফলে কী ভাবে বাংলায় লক্ষ লক্ষ লোক বিচারাধীন (আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন) আওতায় পরে গেলেন তা এখন সকলের জানা।

মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট এক অভূতপূর্ব আদেশ স্থির হল একমাত্র বাংলায় এই সমগ্র বিষয় বিচার করবে খোদ বিচারকেরা। জেলার অফিসারদের সরিয়ে দিয়ে, এদিক ওদিক থেকে ৭০০ বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের আনা হলো আর তাঁরা কাগজের পাহাড় সামলালেন। কাগজের পাহাড় কথাটি আলঙ্কারিক নয়, সত্যিই হিমালয়সমান দায়িত্ব সামলাতে হল বিচারকদের। শেষে দেখা গেল সব মিলিয়ে ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হল। ২৭ লক্ষ লোক এর প্রতিবাদে আপিল বা উত্তরবিচার নিবেদনে ফাইল করলেন। আর বহু লক্ষ লোক জানতেই পারলেন না যে তাঁরা ভোটার তালিকায় থেকে বাদ পড়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আর একটি নির্দেশও অভূতপূর্ব, সুদূরপ্রসারী তার ফলাফল: জনপ্রতিধিত্যা আইনের ২৪ নম্বর ধারা এ বার নিষ্ক্রিয় করা হবে। এই আইন মোতাবেক জেলার নির্বাচন আধিকারিকরা গত ৭৫ বছর ধরে এই সব আপিল দ্রুত গতিতে শুনানী দিয়ে নিষ্পত্তি করেছেন। সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশে এবার এ কাজ করবেন হাই কোর্টের বিচারপতিরা, আর তাঁদের যখন বেশী সময় লাগার কারণে শেষ পর্যন্ত দেখা গেল ২৭ লক্ষ আবেদনকারীরা এবার তাঁদের ভোট দিতে পারবেন না। শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট বলেছিলেন, এই পৃথিবীতে অনেক জিনিস আছে যা আমাদের বোধশক্তির ঊর্ধ্বে। এঁরা ভোট দিতে পারলে কী অংক হত, আর যেখানে আরিরিক্ত মাত্রায় নাম বাদ গেছে তার ফল কী হয়েছে, এই নিয়ে পণ্ডিতেরা বিশ্লেষণ করে চলেছেন, আরও করবেন। তবে সন্দেহ নেই, এর ফলে এ রাজ্যে মুসলিম ও মহিলাদের ভোটার একটা বড় অংশ বাদ গিয়েছে। আর সেই ভোট সম্ভবত তৃণমূলের ঝুলি থেকেই বাদ গিয়েছে।

এখানে অন্য কয়েকটি বিষয় অনস্বীকার্য। যার প্রথম হলো তৃণমূল সরকারের দুর্নীতি, দাদাগীরি আর রাজ্যে অর্থনৈতিক অবনতির বিরুদ্ধে সত্যই এক বিশাল জনরোষ খুবই প্রবল ছিল। তাই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যাঁরা পছন্দ না করলেও ওই দলকেই ভোট দিয়ে এসেছে, সাম্প্রদায়িক দল কে আটকাবার জন্য, তাঁরা উত্তক্ত হয়ে বিজেপির পক্ষে ঝুঁকেছেন। তবে সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি এর ফলে কী হবে জানা নেই — কেননা এখনই রাজ্য জুড়ে জোর গলায় বলছে 'জয় শ্রী রাম' অভিযান চলছে। পনেরো বছর ধরে একটি শ্রেণি বিভিন্ন অ্যাপ নিয়ন্ত্রিত খাদ্য পরিবহণ ও ই কমার্স সংস্থার ডেলিভারি করে বা হকারি করে সংসার টানতে হয়েছে।
আর দেখেছে দু পয়সার পড়ার মাস্তান পার্টি করে কুড়ে ঘর থেকে বিশাল বাড়ি বানিয়ে নিয়েছে। শিক্ষিত যুবকেরা কৈশর থেকে যৌবন শুনতে হয়েছে মোদির পাঁচালী আর তাঁর আশ্বাস। ভোট দেবেন কেন? তাঁরা ভোট দেবেন না কেন, স্লোগানেই বা পিছিয় থাকবেন কেন?

সকলেই এখন উদগ্রীব হয়ে বসে আছে শিল্প, লগ্নী, কর্মসংস্থান, উন্নয়ননের অপেক্ষায়। অনেকেই ভীষণ আনন্দিত ৪৯ বছরের পর এই প্রথম কেন্দ্রীয় সরকারের আর বাংলার একই দলের। দু প্রজন্ম ধরে এত তিক্ততা আর ভাল তো লাগেই না, রাজ্যটির অনেক ক্ষতি হয়েছে। কেন্দ্রের তরফে বন্ধ ছিল আন্তরিক সাহায্য। কিন্তু শিল্প আর লগ্নীর জন্যে যদি 'ডবল ইঞ্জিন' সরকার এতই আবশ্যক, তবে তামিল নাড়ু, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র বা তেলেঙ্গানা এত এগিয়ে গেল কী করে? আর উত্তর প্রদেশ (নয়ডা বাদ দিয়ে), বিহার ও মধ্য প্রদেশের অবস্থা এত শোচনীয় কেন? এ সব যুক্তি যুক্তিতর্ক বাদ দিয়ে এখন প্রার্থনা করি বাংলায় লগ্নি আসুক, কর্মস্থান বাড়ুক।
পরিশেষে একটি কথা। বিজেপি একবার জিতেছে মানেই এই না যে বাংলার উদার সংস্কৃতি সকলেই বর্জন করেছে আর উত্তর ও পশ্চিম ভারতের মতন আমরাও ধর্ম, সম্প্রদায় বা জাত পাত নিয়ে ডুবে থাকব। অস্বীকার করা যায় না যে দুই শতকের নবজাগরণের মূল্যবোধে ক্ষয় ধরেছে আর অনেকেই হটাৎ জাতি-অহংকারে রোগে জর্জরিত। কিন্তু বাংলার সংস্কৃতি, ভাষা আর মূল্যবোধ এখনও যথেষ্ট মজবুত।

বাঙালি সমাজে মুসলমদের এক বিশেষ স্থান আছে। সারা পৃথিবীতে যাঁরা বাংলায় কথা বলেন তাঁদের দুই তৃতীয়াংশ মুসলমান। ওপার বাংলা কিন্তু গোঁড়া ধর্মবাদীদের জেতায় নি। এপার বাংলার প্রগতিশীল সংস্কৃতি নিশ্চয় বিভেদপন্থীদের অযথা বাড়তে দেবে না। সকলে চাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন — ধর্মের বা রাজনীতির নামে তাণ্ডব নয়।

No comments on 'উদার সংস্কৃতি অটুট থাকুক'

Leave your comment

In reply to Some User