ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাই ভারতের এক অনন্য ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ নির্মাণ করেন—তার রাজনীতি, বিপর্যয়, আধ্যাত্মিকতা এবং দৈনন্দিন জীবন। তাঁর ছবিতে ধরা পড়েছে গত শতাব্দীর সবচেয়ে প্রধান ঘটনাগুলি। যেমন বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় রঘু রাই শরণার্থী শিবির, সীমান্ত অঞ্চল এবং যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক মূল্যকে ধারণ করে অসংখ্য মর্মস্পর্শী ছবি তুলেছিলেন। তাঁর ছবিগুলিতে ক্ষুধা, ক্লান্তি এবং আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে বেড়ানো শরণার্থীদের অসহায়তা ফুটে উঠেছিল—যা সারা বিশ্বে গভীর সাড়া জাগায় এবং আজও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল দলিল হিসেবে রয়ে গেছে।

পশ্চিমের পাঞ্জাবি রঘু রাই কারোর কাছে সহজে হার মানত না। তাই যখন উনি ক্যান্সারের সাথে লড়াই শুরু করলেন, যা চলল বছরের পর বছর, আমরা বলতাম ক্যান্সার বাবাজি জানে না কার সাথে টক্কর নিচ্ছে। অতএব হটাৎ তার চলে যাওয়াতে সত্যই হতভম্ব হলাম।

আমরা হারালাম শুধু ভারতের শ্রেষ্ঠ একজন আলোকচিত্রী নয়, সাথে হারালাম এই দেশের আধুনিক ফটোজার্নালিজমের এক কিম্বদন্তি পুরুষ ও রোল মডেল।

রঘুর জন্ম ১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঝাং-এ (বর্তমানে পাকিস্তানে)। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পরেও তার ওই পেশায় মন ভরল না। ষাটের দশকে প্রায় আকস্মিকভাবেই তাঁর আলোকচিত্রের জগতে প্রবেশ।

তিনি দ্য স্টেটসম্যান-এ যোগ দেন আর যুবক রঘু কলকাতার প্রচুর পাড়া আলি গলি হেঁটে বেড়াতেন। কোনো খাবার ডেরা বা ঐতিহাসিক স্থল নেই যা রঘু রাই জানতেন না। আর এই সব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতে ভাল বাসতেন। "তুমি কী রকমের কলকাতার ছেলে গো — এখন ও ছোটা ব্রিস্টলেই যাও নি?" পরে অবশ্য মেট্রো গলির ওই মধুশালায় গিয়ে ওই মহান ত্রুটি টি ঘুঁচিয়ে দিলাম।

পরে ভারতীয় সাংবাদিকতায় এক কেন্দ্রীয় ভিজ্যুয়াল কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন; শেষ পর্যন্ত ইন্ডিয়া টুডে-তে ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাইয়ের কাজের উপর প্রাথমিকভাবে গভীর প্রভাব ফেলেন অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ। তাঁর প্রতিভা স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৭৭ সালে ব্রেসোঁ তাঁকে বিখ্যাত ম্যাগনাম ফটোস-এ মনোনীত করেন—ফলে রাই হন এই সংস্থার প্রথম ভারতীয় সদস্য।

ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাই ভারতের এক অনন্য ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ নির্মাণ করেন—তার রাজনীতি, বিপর্যয়, আধ্যাত্মিকতা এবং দৈনন্দিন জীবন। তাঁর ছবিতে ধরা পড়েছে গত শতাব্দীর সবচেয়ে প্রধান ঘটনাগুলি। যেমন বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় রঘু রাই শরণার্থী শিবির, সীমান্ত অঞ্চল এবং যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক মূল্যকে ধারণ করে অসংখ্য মর্মস্পর্শী ছবি তুলেছিলেন। তাঁর ছবিগুলিতে ক্ষুধা, ক্লান্তি এবং আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে বেড়ানো শরণার্থীদের অসহায়তা ফুটে উঠেছিল—যা সারা বিশ্বে গভীর সাড়া জাগায় এবং আজও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল দলিল হিসেবে রয়ে গেছে।

আর উলেখযোগ্য ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির মানবিক মাশুল তাঁকে অমর করতে পারে।ভোপাল দুর্ঘটনার পর এক শোকাহত পিতার কোলে মৃত শিশুর তাঁর তোলা ছবি বিশ্ব ফটোজার্নালিজমের ইতিহাসে অন্যতম মর্মান্তিক চিত্র হিসেবে বিবেচিত।

এ ছড়া তাঁর ভাণ্ডারে আছে কয়েক হাজার বিশ্ব কাঁপানো ব্যক্তিদের।এদের মধ্য আছেন ইন্দিরা গান্ধী, দালাই লামা এবং মাদার। রাই বিশ্বাস করতেন, আলোকচিত্রে প্রয়োজন ঘনিষ্ঠতা এবং নৈতিক তাগিদ। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—“তুমি যদি যথেষ্ট কাছে না যাও, তোমার ছবি যথেষ্ট ভালো হবে না”—তাঁর কাজের দর্শনকে স্পষ্ট করে: নিমগ্ন, সহানুভূতিশীল এবং নির্ভীক।

তাঁর কাজ অনায়াসে চলাফেরা করেছে তীক্ষ্ণ সাদা-কালো প্রতিবেদনধর্মী ছবির মধ্যে এবং বহুস্তরবিশিষ্ট রঙিন কম্পোজিশনের ভুবনে, সর্বদা ভারতের “স্পন্দন”-এর প্রতি সজাগ থেকে।

বেশ কয়েকটি সম্মাণ ও পেয়েছেন বাংলাদেশ যুদ্ধের কভারেজের জন্য ১৯৭২এ ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী দিয়েছিলেন। আর পেয়েছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার।সাথে দেশে বিদেশে অজস্র চিত্র প্রদর্শনী।

রঘু রাই কেবল ভারতকে ছবি তোলেননি—তিনি ভারতকে নিজেকে দেখতে সাহায্য করেছেন। তাঁর ছবি জনস্মৃতিকে নির্মাণ করেছে, বিপর্যয় ও নীরব মর্যাদা—উভয়কেই দৃশ্যমান রূপ দিয়েছে। অনেকেই জানেন না রঘু রাইয়ের স্ত্রী গুরমিত কত গুণান্বিতা, যিনি রূপ, সৌমতা আর সুদক্ষতার এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সংরক্ষণ স্থপতিদের মধ্যে এক। তাঁর কাজ ও দায়িত্বর মধ্যে ছিল নয়াদিল্লির লালকেল্লা ও মহারাষ্ট্রের গুহাসমূহের মতো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন; অমৃতসর ও পুরীর ঐতিহাসিক বসতিগুলির জন্য নগর সংরক্ষণ পরিকল্পনা। রঘু রাইর পুত্র, নিতিন রাই আলোকচিত্রী হিসাবে নাম করেছে ।

আজ ভারতীয় আলোকচিত্র জগৎ হারাল শুধু এক মহৎ শিল্পীকে নয়, বরং এমন এক সাক্ষীকে, যার কাজ জাতির ঐতিহাসিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল।

No comments on 'যথেষ্ট কাছে না গেলে ভাল ছবি হয় না : রঘু রাই'

Leave your comment

In reply to Some User